যেখানে ঔষধ নয়, মনের জোরেই রোগী সুস্থ হয়!

জুন ২২, ২০২১

 আমরা সবাই কমবেশি 'হাতুড়ে ডাক্তার' শব্দটির সাথে পরিচিত। একটা সময় ছিল, যখন এই হাতুড়ে ডাক্তাররাই বিভিন্ন রোগব্যাধি মোকাবেলায় বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান ভরসাস্থল ছিল। এমনকি খুব গুরুত্বপূর্ণ রোগের ক্ষেত্রেও মানুষ তাদের উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার হার বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ সচেতন হচ্ছে। তাই এখন কেউ অসুস্থ হলে সচরাচর হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছে যায় না।

তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাতুড়ে ডাক্তাররা কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়নি বরং এরা আরো শক্তিশালী হয়েছে। কেননা, তারা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়নি। এখনকার সময়ের হাতুড়ে ডাক্তাররা আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে, আর তারা বিভিন্ন অভিনব উপায়ে আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অসচেতন, অশিক্ষিত ও দুর্বল প্রকৃতির মানুষজনই হচ্ছে তাদের অপচিকিৎসার মূল শিকার। আর এর ফল ভোগ করছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ।

যাহোক, হাতুড়ে ডাক্তার নিয়ে কথা বলা এ লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। আজ কথা হবে হাতুড়ে ডাক্তারের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় নিয়ে, আর সেটি হচ্ছে প্লাসিবো ইফেক্ট। 


প্লাসিবো ইফেক্ট হচ্ছে, রোগীকে দক্ষতার সাথে এমন ওষুধ বা ব্যবস্থাপনা দেওয়া, যার বাস্তবে রোগের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই। কোনো সম্পর্ক তা থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ সময় রোগী সেই ওষুধ বা ব্যবস্থাপনার কারণে সুস্থতা লাভ করে অথবা ভালো বোধ করে। অবাক লাগছে। তাই না? এখন ভালো করে ভেবে দেখুন তো, এ রকম অভিজ্ঞতার সাথে আমরা অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচিত কিনা? এর উত্তরও রয়েছে আমাদের আশেপাশেই।

বেদে বা বাইদ্যাদের কথা হয়তো শুনে থাকবেন। এরা এমন এক জনগোষ্ঠী যারা নানান কবিরাজি চিকিৎসার জন্য পরিচিত ছিল। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট ভিন্ন। সময়ের সাথে সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নানাবিধ উন্নতি সাধনের ফলে মানুষ চিকিৎসার জন্য তাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেললেও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এর উল্টো চিত্র। সাপের কামড়ের চিকিৎসা থেকে শুরু করে দাঁতের পোকা এবং বাতের ব্যথা সহ অসংখ্য রোগের জন্য মানুষ তাদের উপর নির্ভরশীল ছিল।

বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান এসব চিকিৎসা পদ্ধতিকে তীব্রভাবে লোক ঠকানোর কাজ হিসেবে অভিহিত করলেও, সাধারণ গ্রামীণ মানুষজন যে তাদের চিকিৎসা থেকে বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়নি, তা বলা যায় না। এর কারণও স্পষ্ট। সেটি হল, শুধুমাত্র প্রতারণা করে এভাবে শত শত বছর লোক সমাজে টিকে থাকা মোটেও সহজ নয়।

পুড়োটা পড়ুন

জ্যাক মা'র আলিবাবা তৈরির ইতিকথা!

জুন ২২, ২০২১

 

‘আলিবাবা’ নামক চাইনিজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির নাম হয়তো অনেকেই শুনেছেন। এটি খুচরো বিক্রেতাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম। আর এই আলিবাবারই একটি অংশ ‘আলিএক্সপ্রেস' তো আমাদের সকলের নিকটই অত্যন্ত পরিচিত, যার মাধ্যমে আমরা এখন সহজেই ঘরে বসে বিভিন্ন খুচরো বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে পারছি। যে প্লাটফর্মের সুবিধা আমরা বর্তমানে খুব সহজেই লুফে নিচ্ছি, তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এবং বিস্তৃত হওয়ার সফর নিতান্তই সহজ ছিল না। এক্ষেত্রে আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মাঁ অবশ্যই নিজের অসম্ভব ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। জ্যাক মাঁ'কে এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত করতে যেভাবে প্রতিনিয়তই উত্থান-পতনের সম্মুখীন হতে হয়, তেমনি বাস্তব জীবনেও তাকে সবসময় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। 

চলুন প্রথমে জ্যাক মাঁ সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক এবং এরপর জানা যাক কীভাবে তিনি আলিবাবাকে বর্তমানের অবস্থায় আনেন।

১৯৬৪ সালের ১৫ অক্টোবর জ্যাক মাঁ চীনের হাংঝুর খুব সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা-বাবা সেখানকার ঐতিহ্যগত সংগীতশিল্পী এবং গল্পকার ছিলেন। পরিবারের অর্থনেতিক অবস্থা এতটাই দুর্বিষহ ছিল যে তাদেরকে মধ্যবিত্ত পরিবার বলাও চলে না। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’-এর মতো অবস্থা আরকি। জ্যাক মাঁ'র জন্ম এমন একটা সময়ে, যখন তার পরিবারে ছিল অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আর দেশে রাজনৈতিক দুরবস্থা। সেই সময়ে চীনে কমিউনিজম তথা সাম্যবাদের উত্থান ঘটে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সবদিক থেকেই প্রতিকূলতা থাকায় পড়াশোনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন জ্যাক মাঁ। কিন্তু কিছু সময় পরই তার ভাগ্য ফিরল। ১৯৭২ সালে হাংঝুতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের আগমন অস্থির পরিবেশকে কিছুটা হলেও শান্ত করতে সক্ষম হয়। আর এই সুযোগকে খুব ভালোভাবেই কাজে লাগান তিনি। ইংরেজি শেখার দৃঢ় ইচ্ছা ছিল এবং তিনি তা শেখাও শুরু করেন এই সময়ে। এমনকি ইংরেজিতে স্নাতক পাস করে হাংঝু ডায়ানঝি ইউনিভার্সিটিতে মাসিক ১২ ডলারের জন্য পড়ানো শুরু করে। এই সাধারণ শিক্ষকই একদিন কোটিপতিদের তালিকায় নাম লেখান। কাজটা নিতান্তই সহজ ছিল না।

তাছাড়া জ্যাক মাঁ'র জীবনে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতাও কম ছিল না। প্রাথমিক স্কুলে দু'বার, আর মাধ্যমিক স্কুলে তিনবার অকৃতকার্য হন। হাংঝু নর্মাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ১০বার আবেদন করেন এবং প্রতিবারই বাদ পড়ে যান। স্নাতক পাস করার পূর্বে এবং পরে বারবার আবেদন করেও কোনো চাকরি পাননি। আর এই আবেদনের সংখ্যা ছিল ৩০! এমনকি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়া শুরু করলে প্রথম দু'টি উদ্যোগই ব্যর্থ হয়।

বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাখানের সম্মুখীন হতে হতে জ্যাক মাঁ ১৯৯৫ সালের দিকে প্রথম কোনো সফলতা দেখতে পান। তাকে 'হাংঝুর সর্বোত্তম ইংরেজি বক্তা' আখ্যা দেওয়া হয়। সে বছর মহাসড়ক নির্মাণের জন্য সরকারের গৃহীত একটি প্রজেক্টের জন্য কাজ করতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়। আর সেখানেই তিনি প্রথমবারের মতো কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের সাথে পরিচিত হন। আসলে সেই সময়ে চীনে কম্পিউটার অনেকটাই বিরল ছিল। আর ইন্টারনেট এবং ই-মেইলের তো বলতে গেলে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেজন্য জ্যাক মাঁ এই নতুন প্রযুক্তি দেখে বেশ বিস্মিত হন এবং নতুন জিনিসটি বোঝার জন্য বেশ উঠেপড়ে লাগেন। তিনি ব্রাউজারে প্রথমেই ‘বিয়ার' লিখে সার্চ দেন। একটি জিনিস সম্পর্কে এত তথ্য একসাথে পেয়ে বেশ অবাক হন। চীন সম্পর্কে ইন্টারনেটে কী কী তথ্য পাওয়া যায়, তা জানার জন্য উৎসুক হয়ে পড়েন। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো চীন সম্পর্কে কোনো তথ্য ব্রাউজারে ছিল না। আর তখন থেকেই তার মাথায় ঘুরতে থাকে, চীন এবং তার আমজনতার কাছে ইন্টারনেটকে কীভাবে পরিচিত করে তোলা যায় এবং ব্রাউজারে নিজের দেশের অস্তিত্ব ফুটিয়ে তোলা যায়।

জ্যাক মাঁ’র মাথায় ই-কমার্স স্টার্ট আপের একটি বুদ্ধি ঘুরপাক খেতে থাকে। তিনি তার আরো ১৭জন বন্ধুকে তার প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে রাজি করেন। তার এই নতুন ই-কমার্স স্টার্ট আপটিই হলো আলিবাবা, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। প্রজেক্টটি খুব ঘরোয়াভাবেই নিজের অ্যাপার্টমেন্টে শুরু করেন তারা। পরবর্তী সময়ে আলিবাবা পরিচালনার জন্য বাইরে থেকে মূলধন সংগ্রহ করা শুরু করেন। তারা ‘সফটব্যাংক’ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার এবং ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলারের মূলধনের যোগানও পেয়ে যান। বিনিয়োগ সংগ্রহ করা কিংবা প্রজেক্ট শুরু করার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কঠিন ছিল চীনের সাধারণ জনগণকে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম এবং প্যাকেজ ট্রান্সফার বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত করানো। প্রথমদিকে আলিবাবা একটু ঝিমিয়ে চললেও একুশ শতকের আগমন জ্যাক মা এবং তার নবপ্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইটের জন্যও শুভই ছিল। 

অবশ্য নামের সাথে অন্তত যেন সাধারণ জনগণ পরিচিত থাকে এবং এর সূত্র ধরে একটু হলেও এই ওয়েবসাইট ব্যবহারে আগ্রহী হয়, সেজন্য তিনি খুব ভেবেচিন্তেই নামটা ঠিক করেন। ২০০৬ সালে সিএনএন'স টক এশিয়া প্রোগ্রামের একটি ইন্টারভিউতে জানান যে, তিনি স্যান ফ্রান্সিসকোর একটি ক্যাফেতে ছিলেন, যখন হঠাৎ করেই ‘আলিবাবা’ নামটি তার মাথায় আসে। সেই ক্যাফেরই এক পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এই নামটি সম্পর্কে কিছু জানেন নাকি। এর প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, “ওপেন সিসেম”। এটি ‘আলিবাবা এবং চল্লিশ চোর' গল্পটির অতি পরিচিত একটি বাক্য, যা গল্পে বললেই ধনের ভাণ্ডারের গোপন দরজা খুলে যায়।

তারপর তিনি রাস্তায় এলোমেলোভাবে অনেকের কাছেই জানতে চান, আলিবাবা নামটি সম্পর্কে তারা কী কী জানেন। সবার কাছ থেকেই ইতিবাচক মতামত তাকে এই নামটিই বেছে নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। জ্যাক মাঁ বলেন যে, আলিবাবা ছিলেন একজন দয়ালু এবং একইসাথে চালাক ব্যবসায়ী। তিনি গ্রামবাসীকেও সহায়তা করেন। আর এই ব্যক্তিত্বের জন্যই নামটি তার বেশ ভালো লাগে। বর্তমানে আলিবাবা ছোট থেকে মাঝারি সাইজের কোম্পানি নিয়ে কাজ করে। 

সফটব্যাংক থেকে বিনিয়োগ পাওয়ার পরপরই আলিবাবার সুদিনের আরম্ভ ঘটে। কোম্পানির বৃদ্ধিও বেশ বাড়তে থাকে। যখন কোম্পানিটি ক্যাশ পজিটিভ হয়ে যায়, তখন আলিবাবা ‘তাওবাও.কম' প্রতিষ্ঠা করে।

পুড়োটা পড়ুন

ব্ল্যাকহোলে আলোর ঝিলিক!

জুন ২১, ২০২১


 নাসা জানিয়েছে, সান ডিয়েগোর কাছে পালোমার অবজারভেটরিতে বসানো ‘জুইকি ট্রানসিয়েন্ট ফেসিলিটি (জেডটিএফ)’ টেলিস্কোপেই ধরা পড়েছে এই বিরল দৃশ্য। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’-এ। গত বছরের ২১ মে সেটি নাসার নজরে আসে।

নাসা বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পাশাপাশি হয়তো এই আলোর ঝিলিকই ব্ল্যাকহোলের রহস্যজগতের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করবে।

নাসা জানিয়েছে, এই আলোর ঝিলিক দেখা গিয়েছে একে অন্যের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে কাছে এসে পড়া দুটি ব্ল্যাকহোলের মধ্যে খুব জোরে সংঘর্ষের কারণে। ওই ধাক্কাধাক্কিতে তুলনায় ছোটখাটো দুটি ব্ল্যাকহোল (সূর্যের চেয়ে একটু বেশি ভারী) মিলেমিশে গিয়ে একটি বড় ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছে। আলোর ঝিলিকটা বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে নতুন সৃষ্ট বড় ব্ল্যাকহোলটি থেকে।

পুড়োটা পড়ুন

একজন নির্জনতম কবি জীবনানন্দ

জুন ১৮, ২০২১


কবি বলেছিলেন,
“আমি কবি, সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি
ঝরাপালকের ছবি”
কিছুকালের জন্য তিনি এসেছিলেন এই পৃথিবীতে। বাংলার রূপ দেখে পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাননি তিনি। বাংলার ঘাস, বাংলার বাতাস, বাংলার পাখি, বাংলার শাখী, বাংলার পতঙ্গ, বাংলার বিহঙ্গ তার মন হরণ করেছিল। তিনি ছিলেন নির্জনতার কবি। কবিতায় এঁকেছিলেন অপরূপ প্রকৃতির ছবি। আরেকটি নামে তাকে ডাকা হয়- তিমির হননের কবি।
ফিচার ইমেজ; Image Source : banglanews24
ফিচার ইমেজ; Image Source : banglanews24
হ্যাঁ। জীবনানন্দ দাশের কথাই বলা হচ্ছে। পারিবারিক উপাধি ছিল দাশগুপ্ত। ব্রাহ্ম সমাজে দীক্ষিত হওয়ার পর গুপ্ত-কে কবি নিজেই ছেটে বাদ দিয়েছিলেন।
চরম দারিদ্র্য ও ক্লান্তি তার দেহকে গ্রাস করলেও তার মননকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরিশাল শহরের সত্যানন্দ দাশগুপ্তের ঘর আলো করে এসেছিলেন জীবনানন্দ। মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন বিদূষী, স্বভাবকবিও বটে। আদর করে ছোট্ট জীবনানন্দকে মা ডাকতেন 'মিলু'। সেই মিলু একদিন বাংলা সাহিত্যের এত বড় নক্ষত্রে পরিণত হবে- সে লক্ষণ বাল্যজীবনেই মা বুঝতে পেরেছিলেন।
একদিন সকালে প্রহ্লাদ গোয়ালা দুধ দিতে এসেছিল সত্যানন্দ দাশগুপ্তের বাড়িতে। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে বালক মিলুর ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। মুখ থেকে অবচেতনভাবেই বেরিয়ে এসেছিল,
“আপনি বড় ভালো পড়েন গো, দাদাবাবু”।
গোয়ালা সেই কবিতার মর্মার্থ বুঝতে পারেনি। আবৃত্তির সুন্দরতাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল।
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ; Image Source : thedailystar.net
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ; Image Source : thedailystar.net
আরেকদিনের ঘটনা। তখন ছিল বর্ষাকাল। মিলুদের বাড়ির আঙিনা সবুজ ঘাসে ভরে গিয়েছে। ফকির নামক এক দরিদ্র চাষিকে সত্যানন্দবাবু আঙিনা পরিষ্কার করতে ডাকেন। ফকির সবুজ নির্মল ঘাসের উপর কাস্তে চালাতে থাকে। সে দৃশ্য দেখে কাতরাতে থাকে বালক জীবনানন্দ। সে বয়সেই কয়েক গোছা ঘাসকেও মনের কুঠুরিতে স্থান দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। ফকির সান্ত্বনা দিয়ে তাকে বলেছিল,SIGN UP
“চিন্তা কইরবেন না দাদাবাবু, কিছুদিন পরেই আবার নতুন, সবুজ, কচি ঘাস জন্মাবে”।
কে শোনে কার কথা? ছোট্ট মিলুর কষ্ট যেন কমতেই চায় না।
শিশু জীবনানন্দ ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ত। অসুস্থ জীবনানন্দকে নিয়ে কুসুমকুমারী কোথায় ঘুরে বেড়াননি? কলকাতা থেকে দেওঘর, লক্ষ্ণৌ থেকে আগ্রা, দিল্লী থেকে মাদ্রাজ কোথায় যাননি? মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে এভাবেই পুরো ভারত চষে বেড়িয়েছেন জীবনানন্দ। বাবাকে একটু ভয় পেতেন। সব কথার শেষকথা ছিল বাবার কথা। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন লোকহিতৈষী একজন মানুষ। তাকে সবাই শ্রদ্ধা করত। বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের একজন কর্ণধার ছিলেন তিনি। ছিলেন সুবক্তা ও সুলেখকও। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা ও মননশীলতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। শিশুদের অল্পবয়সে স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে তার দ্বিমত ছিল।
জীবনানন্দকে তাই স্কুলে পাঠানো হয়েছিল একটু দেরিতে। তাই বলে শিক্ষা থেমে থাকেনি। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বাবার উপনিষদ পাঠ আর মায়ের মিষ্টি-মধুর গান শুনে তার দিন শুরু হতো। কুসুমকুমারী দাশ ছন্দে ছন্দে কথা বলতেন। রান্নাঘরে মশলা কুটতে কুটতে লিখেছিলেন 'আদর্শ ছেলে' কবিতাটি। ছোট ছেলে অশোকানন্দের স্কুলের বার্ষিক কবিতা আবৃত্তির জন্য কবিতাটি লিখেছিলেন।
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে..”।
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ; Image Source : Pinterest
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ; Image Source: Pinterest
জীবনানন্দের মধ্যেই হয়তো সেই ছেলেকে খুঁজেছিলেন কুসুমকুমারী দাশ। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দরা ছিলেন সাত ভাই। জীবনানন্দেরা দুই ভাই, এক বোন। ছোট ভাই অশোকানন্দ নয় বছরের ছোট, আর ছোট বোন সুচরিতা দাশ ষোল বছরের। সব মিলিয়ে একান্নবর্তী সংসার। কবির শৈশবের স্মৃতিগুলো ছিল মধুর। লাজুক স্বভাবী, নিভৃতচারী, অল্পভাষী জীবনানন্দকে সবাই পছন্দ করত। পারিবারিক এক উষ্ণ আবহে তার শৈশব কেটেছে।
জীবনানন্দের বরিশালের বাড়ি; Image Source : thedailystar.net
জীবনানন্দের বরিশালের বাড়ি; Image Source : thedailystar.net
শৈশবে প্রকৃতি তাকে যে সৌন্দর্যরূপের প্রতিবেশ দিয়েছে, সেটাই তার পরের কবিত্বের জীবনের সহায়ক ছিল- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ছিল 'ঝরা পালক'। এটি যখন ছাপা হয়, তখন কবির বয়স আটাশ। তিন বছর পর তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ে করেন রোহিণী কুমার গুপ্তের মেয়ে লাবণ্য গুপ্তকে। তাদের দুটি সন্তান হয়েছিল- মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ছেলে সমরানন্দ। জীবনানন্দের বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না। বিয়ের পরও অনেকদিন তাকে বেকার বসে থাকতে হয়েছে। অনেকবার আত্মহননের কথাও ভেবেছেন। তারপর কী মনে করে যেন ফিরে এসেছেন। খুশি থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সমরানন্দের সাথে খেতে বসলেই ছেলের পাতের ডিম নিয়ে কাড়াকাড়ি, স্ত্রী লাবণ্যের সাথে খুনসুটি- এসব তার সুখী থাকার চেষ্টাকেই নির্দেশ করে।
জীবনে সবকিছু খুব সহজভাবে নিতে পারতেন বলেই জীবনানন্দের ছিল আলাদা স্বকীয় এক জগত। শুধুই লিখেছেন। সেই লেখা ছাপাখানায় পাঠিয়ে অর্থ উপার্জনের সাবলীল পন্থাকে তিনি খুব সহজভাবে নিতে পারেননি।
তরুণ জীবনানন্দ; Image Source : wikiwand
তরুণ জীবনানন্দ; Image Source : wikiwand
কাউকে দেখানোর জন্য নয়, তিনি লিখতেন নিজের জন্য। লিখে ট্রাঙ্ক ভর্তি করে রেখে দিতেন। সারা জীবনে তার প্রকাশিত রচনার সংখ্যা বড়জোর তিনশোর মতো হবে। এখন যা পাওয়া যায়, সেগুলো তার মৃত্যুর পরে উদ্ধার করা। একবার ট্রেনে করে ফেরার পথে কবির ট্রাঙ্ক চুরি হয়ে যায়। ট্রাঙ্কের সাথে সাথে হারিয়ে যায় লেখা পাণ্ডুলিপিগুলো। এগুলোর কয়েকটি পরে উদ্ধার করা গেলেও সব যায়নি। সেদিন পৃথিবীবাসী বঞ্চিত হয়েছিল অপ্রকাশিত সেই লেখাগুলো থেকে।
একবার কবি সপরিবারে দিল্লী বেড়াতে যান। ছোট ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে। অশোকানন্দের ঘরে তখন তার সাত বছরের সন্তান অমিতানন্দ। একদিন তারা সবাই মিলে দিল্লী ঘুরতে বের হলেন। ঘুরতে ঘুরতে অমিতানন্দ বড়দিদি মঞ্জুশ্রীর হাতের বালা হারিয়ে ফেলে। এতে জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দেবী ও অশোকানন্দের স্ত্রী নলিনী দেবী ছোট্ট অমিতানন্দকে বকাঝকা করেন। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই কবির। তিনি আপন মনে আত্মভোলা হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছেন সবকিছু। সেদিন নলিনী দেবী জীবনানন্দের একটি ছবি তুলে দেন। সেই ছবিই এখন বই-পত্তর, পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়।
দিল্লীর রাজঘাটে সপরিবারে জীবনানন্দ দাশ, (বা দিক থেকে) স্ত্রী লাবণ্য দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ভাইপো অমিতানন্দ ও ছেলে সমরানন্দ; Image Source : billwa90.blogspot.net
দিল্লীর রাজঘাটে সপরিবারে জীবনানন্দ দাশ, (বাঁ দিক থেকে) স্ত্রী লাবণ্য দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ভাইপো অমিতানন্দ ও ছেলে সমরানন্দ; Image Source: billwa90.blogspot.net
জীবনানন্দ ও তার লেখা সেসময় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। তার সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন সজনীকান্ত দাশ। সজনীকান্ত তাঁর শনিবারের চিঠি-তে জীবনানন্দের লেখার ব্যঙ্গাত্মক ও কড়া সমালোচনা করতেন। সমালোচনা করে সজনীকান্ত লিখেছিলেন ‘গণ্ডারমারী কবিতা'। একবার লিখেছিলেন,
“জীবনানন্দের লেখা নির্জন পেঁচার মতো প্রাণ যদি অলৌকিক না হয় তবে সীতার পাতাল প্রবেশও অলৌকিক নয়”।
এত্তসব সমালোচনার শরকে উপেক্ষা করে জীবনানন্দ মুচকি হেসে বলেছিলেন,
“সজনীকান্তবাবু তো আমার ভালোই প্রচার করছেন”।
জীবনানন্দের প্রিয় শহর ছিল কলকাতা। কলকাতার আবহে তিনি ছিলেন মোহাচ্ছন্ন। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের চাকরি ছাড়ার পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। বাগেরহাটের কলেজে চাকরিরত অবস্থায়ও ছুটি পেলেই কলকাতায় চলে যেতেন। কলকাতায় কবি কখনও মেসে ছিলেন, কখনও ছিলেন অশোকানন্দের বাড়িতে; আর একটু দীর্ঘ সময় ছিলেন ল্যান্সডাউনের এক ভাড়াবাড়িতে। এই কলকাতাতেই কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
যেদিন ট্রামের দুর্ঘটনাটি ঘটে, তার আগের দিন রেডিও-তে আবৃত্তি করেছিলেন ‘মহাজিজ্ঞাসা’ কবিতাটি। দুর্ঘটনার দিন সকালেও বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিন বিকেলেও হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। দুই থোকা ডাবও কিনেছিলেন। দু'হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, এমন সময় ঘাতক ট্রামটি কবির উপর চড়ে বসে। গুরুতর আঘাত পান তিনি। কণ্ঠ, উরু ও পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়।
তার চিৎকার শুনে পাশের চায়ের দোকানদার চুনিলাল ও অন্যরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। ড. ভূমেন্দ্র গুহ সহ অনেক কবি-সাহিত্যিক তার প্রাণ বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেন। সজনীকান্ত দাশ তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়কে অনুরোধ করেন কবিকে দেখার জন্য। বিধান রায় সে অনুরোধ রেখেছিলেন। যমে-মানুষে আটদিনের লড়াই চলে। তারপর সব স্থির হয়ে যায়। জীবনানন্দ তার প্রিয় বাংলা, কলকাতাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তিটি ছিল,
“ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে”।

পুড়োটা পড়ুন

অ্যালগরিদম আসলে কি?

জুন ১৭, ২০২১



 অ্যালগরিদম শব্দটির অর্থ নির্দেশনা। শব্দটি দেখলে আমরা জটিল মনে করে চোখ ফিরিয়ে নেই, মনে করি শুধু গণিত আর বিজ্ঞানেই এর ব্যবহার। কিন্তু আসলে অ্যালগরিদম আমরা ব্যবহার করছি সবসময়ই। কোনো কাজ সমাধান করার যে ধাপ বা নির্দেশনা সেগুলোই হচ্ছে অ্যালগরিদম। নিচের অ্যালগরিদমটি দেখলেই মোটামুটি একটি ধারণা আসবে।

চা বানানোর অ্যালগরিদম Image Source: The New Junior Academy

আমরা মনে করি আধুনিক পৃথিবীতেই অ্যালগরিদম ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু অ্যালগরিদমের ব্যবহার চলে আসছে সহাস্রব্দ ধরে। গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারেজমি অ্যালগরিদম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন নবম শতাব্দীতে। তিনি হিন্দি-আরবীয় সংখ্যার উপর একটি বই লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় রুপান্তর করা হয়। এরপর ল্যাটিন শব্দ algoritmi থেকে আসে Algorithm।

ঐতিহাসিক রেকর্ড ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী প্রথম অ্যালগরিদমের ব্যবহার করেন ব্যবিলনীয়রা। তারা অ্যালগরিদমের সাহায্যে স্কয়ার রুটের মান ও খুব সাধারম হিসেব করতো। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউক্লিড তার ‘Euclidean Algorithm’ উদ্ভাবন করেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলামি বিশ্ব আরও জটিল ক্রিপ্ট্যালাইসিস, এনক্রিপশন এবং সাইফারের (সংকেত লেখনী) অ্যালগরিদম নিয়ে কাজ করে।

খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সালের একটি মেডিক্যাল ট্যাবলেট; Image Source: Wikimedia Commons

তবে বর্তমানের আধুনিক অ্যালগরিদমের উৎপত্তি হয় শিল্প বিপ্লবের মাঝ থেকে শেষের দিকে। তখন জর্জ বুলি বাইনারি বীজগণিত আবিষ্কার করেন যা আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি। এরপর অ্যাডা লাভলেস ১৮৪০ সালে প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেন যার মাধ্যমে অ্যালগরিদম প্রবেশ করে আধুনিক জগতে। তবে প্রথম যে মানুষটি অ্যালগরিদমকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যান তিনি অ্যালান টুরিং। এরপর অলনজো চার্চের ল্যামডা ক্যালকুলাস সংযোজন আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের পথ খুলে দেয়।

পুড়োটা পড়ুন

ইয়াহুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প

জুন ১৭, ২০২১


 ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বর্তমানে ১৪০টিরও বেশি সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে । কিন্তু সেসব ব্যবহার করা তো দূরের কথা, আমরা ক’টারই বা নাম জানি? সার্চ ইঞ্জিন বলতে বেশিরভাগ মানুষ গুগলকেই চিনে থাকে, তবে ইন্টারনেটের সাথে যাদের পুরনো যোগসূত্র রয়েছে এবং দীর্ঘসময় ধরে সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে আসছেন, তারা গুগলের পাশাপাশি ইয়াহুকে রাখতে চাইবেন। কেননা এই সার্চ ইঞ্জিনটিই একসময় নেটের দুনিয়ায় রাজত্ব করেছে।

২০০৫ সালে ইয়াহু ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইটগুলোর মাঝে অন্যতম। আজকে যেমন আমরা গুগলের মেইল বা জিমেইল ব্যবহার করছি, সেসময় প্রায় অধিকাংশ মানুষই ইয়াহু মেইল ব্যবহার করতো। ২০১১ সালে ক'দিনের জন্য শীর্ষস্থানও দখল করে ইয়াহু মেইল। কিন্তু ধীরে ধীরে গুগল যেন ইয়াহুর থেকে সবই ছিনিয়ে নিতে লাগল। অবশেষে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে মার্কিন টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ভেরাইজনের কাছে ৪.৪৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মূল ব্যবসা বিক্রির সম্মতি প্রকাশ করে ইয়াহু। এই চুক্তিকে ফোর্বসের লেখক ব্রায়ান সলোমন প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে দুঃখজনক চুক্তি  হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইয়াহুর পতনের সাক্ষী হয়তো আমরা সবাই, কিন্তু এর গৌরবের দিনগুলো সম্পর্কে কমই জানি। চলুন জানা যাক সেই গল্প।

শুরুর ইতিহাস

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডেভিড ফিলো এবং জেরি ইয়াং এর হাত ধরে ১৯৯৪ সালে ইয়াহু তার যাত্রা শুরু করে। তবে শুরুতে কিন্তু নাম ইয়াহু ছিল না। ডেভিড এবং জেরি তাদের ওয়েবসাইটের নাম দিয়েছিলেন “David and Jerrys guide to the World Wide Web” । '৯৪ সালেরই মার্চ মাসে ওয়েবসাইটটির নাম পরিবর্তন করে 'ইয়াহু' রাখা হয়। সেসময় পুরো ইন্টারনেট জগত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। তাই ওয়েবসাইটটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিলো টেলিফোন ডিরেক্টরির মতো ওয়েবসাইটের একটি ডিরেক্টরি তৈরি করা। সেসময় দুই সদ্য গ্রাজুয়েটের এই ওয়েবসাইট ছিল প্রযুক্তিজগতের বৃহৎ প্রচেষ্টাগুলোর মাঝে অন্যতম।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের পরিচিতি সেভাবে না থাকা সত্ত্বেও নব্বই-এর দশকে ইয়াহু দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৬ সালে ইয়াহুর যখন প্রথম পাবলিক অফারিং হয় তখন এর মূল্য ছিলো প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকলে যে সফল হওয়া সম্ভব ইয়াহু তার চরম একটি উদাহরণ। পরবর্তী দু'বছরে কোম্পানিটির স্টক মূল্য প্রায় ৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৮ সালের মাঝেই ইয়াহুতে যুক্ত হয় ইমেইল, শপিং, গেমস, ট্রাভেলিং, ম্যাপস, ওয়েদার, অনলাইন ম্যাগাজিনসহ নানা সেবা।

ইয়াহুর শেয়ার বাড়তে বাড়তে সেই সালে মোট মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে। ঝড়ের গতিতে যাত্রা শুরু করেছিল ইয়াহু। সার্চ ইঞ্জিন এবং ফ্রি ইমেইল সেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে শীঘ্রই প্রযুক্তিবাজারের শীর্ষস্থানীয় তালিকায় নাম লিখিয়ে নেয় কোম্পানিটি। তবে তখনও গুগল তার যাত্রা শুরু করেনি, কালো ছায়ার দিন যে সামনেই তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

ইয়াহুর সময়গুলো ছিলো তরঙ্গের মতো- কখনো উপরে তো কখনো নিচে। ২০০০ সালে ইয়াহুর মোট মূল্যমান দাঁড়ায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর পরপরই ডট কম সাইটগুলো হুট করেই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এবং মূল্যও অত্যধিক বেড়ে যায়। একে ডট কম ক্রাশ বা Dot com bubble বলা হয়। এসব সাইটের উচ্চমূল্যের কারণে ইয়াহুর মূল্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মাত্র ২ বছরেই ১২৫ বিলিয়ন থেকে ২০০২-এ গিয়ে নেমে যায় ১০ বিলিয়নে, যা অতীত গৌরবের ছায়ামাত্র।

আজকে আমরা যে সেবাগুলোকে প্রাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করি, যেমন- ইউটিউব, ফেসবুক এগুলোর ধারণাও জন্মেছিল ইয়াহু থেকেই। ইউটিউবের মতো একটি প্লাটফর্ম ছিলো Broadcast.com, যা পরবর্তীতে Yahoo TV হিসেবে চালানো হয়। এছাড়া ছিলো ইন্সটাগ্রামের মতো Flickr, Evernote এর মতো Yahoo Notebook এবং Yahoo Music ছিল সেসময়ের Spotify। তবে কোথায় হারিয়ে গেল সেসব?

ভুল সিদ্ধান্তের পাহাড়

ইয়াহুর পতনের পেছনে হয়তো নানা তত্ত্বই দাঁড় করানো যাবে, কিন্তু ইয়াহুর নেয়া সিদ্ধান্তগুলোতে যে ব্যাপক ভুল ছিল এই কথায় সবাই সম্মতি জানাবে। গুগলের আজকের অবস্থানে আসার পেছনেও ইয়াহুর ভুলই দায়ী।

১৯৯৮ সালে স্ট্যানফোর্ডেরই দুজন পিএইচডি শিক্ষার্থী ইয়াহুর কাছে তাদের অ্যালগরিদম বিক্রির জন্য গিয়েছিল। ১ মিলিয়ন ডলারে ঐ অ্যালগরিদম কেনা তখন ইয়াহুর যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। কারা ছিলেন ঐ দুই তরুণ? গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন। তাদের তৈরি পেজর‍্যাঙ্ক অ্যালগরিদমের কারণেই আজ আমরা গুগলে একটি শব্দ লিখলেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেয়ে যাচ্ছি।

গুগল ভালোভাবে প্রতিষ্ঠালাভের পরেও ল্যারি এবং সের্গেই গুগলকে ইয়াহুর কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ইয়াহুর তৎকালীন সিইও টেরি সেমেল তা গায়েই লাগাননি। যখন তার সম্মতি প্রদানের ইচ্ছে হলো তখন গুগলের দাম বেড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে গিয়েছে!

ওই সময়ের আশেপাশেই এক ২২ বছর বয়সী যুবক ইয়াহুর প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, সে ছিল মার্ক জাকারবার্গ। ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ফেসবুককে কিনতে চেয়েছিল ইয়াহু, কিন্তু জাকারবার্গ রাজি হননি।

শুধু কেনার ক্ষেত্রেই নয়, বিক্রির ক্ষেত্রেও ইয়াহু নিয়েছিল ভুল সিদ্ধান্ত। ২০০৮ সালে মাইক্রোসফট ৪৪.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ইয়াহুকে কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে, যা ইয়াহুর বর্তমান মূল্যের চেয়ে ঢের বেশি। কিন্তু তখন সেটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ভুল বিনিয়োগ

১৯৯৯ সালে ইয়াহু দুটি বিখ্যাত অধিগ্রহণ চুক্তি করে, যা প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম দুই বাজে চুক্তি হিসেবে বিবেচিত। এর মাঝে একটি Geocities, এবং আরেকটি Broadcast.com। 

সেসময়ে Geocities ইন্টারনেট বিশ্বে তৃতীয় সর্বাধিক ব্রাউজ করা সাইট ছিল। ১৯৯৯ সালে ইয়াহু ৩.৭ বিলিয়ন ডলারে জিওসিটিসকে কিনে নেয়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটে তাদের নিজেদের হোমপেজ তৈরি করতো। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নতুনত্ব না থাকায় ধীরে ধীরে এটিও তার ব্যবহারকারী হারাতে থাকে এবং ২০০৯ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়।

একই বছরে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস ব্রডকাস্টকে ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় ইয়াহু। পরবর্তীতে ইয়াহু ব্রডকাস্ট থেকে পৃথকভাবে মিউজিক এবং ভিডিও সার্ভিস চালু করে। ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্য সেসময়ের ইন্টারনেট অনেক ধীরগতির ছিল। বলা যায়, ব্রডকাস্ট ছিল সময়ের চেয়ে অগ্রসর। ইয়াহু ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করতে পারলেও ব্রডকাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক কিউবান নাম কামিয়ে নিয়েছিলেন।

২০০৫ সালে ইয়াহু ফটো শেয়ারিং সাইট Flickr-কে ৩০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। তারা একে সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে রুপান্তর করতে চাইলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেখানেও ব্যর্থ হয়। নতুনত্ব না এনে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় সেটিই ছিলো মূল চিন্তা। একই বছরে ইয়াহু আলিবাবার ৪০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। পরবর্তীতে এর কারণেই ইয়াহু দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং এই শতাংশের বর্তমান মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু কেন এত ব্যর্থতা ঘিরে ধরেছিল ইয়াহুকে? কারণ ইয়াহুর কোনো সিইও-ই আদর্শ ছিলেন না। শুরু থেকেই কোম্পানিকে কীভাবে চালানো হবে এ নিয়ে কারোরই স্পষ্ট কোনো দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। তারা না ছিল কোনো সার্চ কোম্পানি, না কোনো টেক কোম্পানি। ইয়াহু ছিল একটি মিডিয়া কোম্পানি যাদের কাছে প্রযুক্তি ছিল লাভ তৈরির একটি ক্ষেত্র। ব্যর্থতার পেছনে সিইও ছাড়াও দায়ী কর্মীরা। অদক্ষ কর্মীতে ভরপুর ছিল ইয়াহু। ফলে কোনো খাতেই নতুনত্ব আনতে তারা সক্ষম হয়নি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইয়াহু ১১৪টি কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছিল, যার একটিও তাদের গৌরব ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

২০১২ সালে ইয়াহুতে সিইও হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক গুগল কর্মী মেলিসা মেয়ার। ইয়াহুর ইতিহাসে এই একজনই পারতেন কোম্পানিকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু মেলিসার আসতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সর্বস্ব হারানো কোম্পানিকে মেলিসাও ঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন এবং শেষপর্যন্ত ২০১৬ সালে ইয়াহুর ইন্টারনেট ব্যবসার ইতি ঘটে এবং কোম্পানির বাকি অংশগুলো নিয়ে Altaba.Inc গঠিত হয়।  

প্রযুক্তির স্রোতের সাথে তাল মিলাতে না পারলে বিলিয়ন ডলার কোম্পানিও যে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে ইয়াহু তার বাস্তব উদাহরণ। ফিলো এবং ইয়াং যা তৈরি করেছেন নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবিদার, কিন্তু তারা ইয়াহুকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। ভুল সিদ্ধান্ত ও বাজে ব্যবস্থাপনাই ইয়াহুর অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছে। ইয়াহুর নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো যেকোনো প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রইবে।


পুড়োটা পড়ুন

ভিটামিন সি এর আবিষ্কার

জুন ১৫, ২০২১

 কয়েক শতাব্দী আগে, জাহাজে অবস্থানরত নাবিকেরা মুখে ঘা, ত্বকের রক্তক্ষরণ, ক্ষতস্থানের ধীরগতিতে নিরাময়সহ বিভিন্ন উপসর্গে ভোগে। এর ফলে অনেকের মৃত্যু ঘটে। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধের ইতিহাসে নাবিকদের এ রোগে ভোগার ও মৃত্যুর হার ছিল ব্যাপক। কুলম্বের আটলান্টিক সমুদ্রযাত্রা ও স্টিম ইঞ্জিন উৎপত্তির মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২ মিলিয়ন নাবিক এ রোগে ভোগে। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ভাস্কো- ডা-গামা, ম্যাগালান, জর্জ অ্যানসন প্রমুখও এ রোগের কবল থেকে রেহাই পাননি।



কী ছিল এ রোগের কারণ? প্রকৃতপক্ষে জাহাজিদের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন 'সি' এর সরবরাহ কম হওয়ায় তারা স্কার্ভিতে ভোগে। ১৭৫৩ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল কমিউনিটি  এ রোগকে বিশদভাবে খাদ্যতালিকাগত ঘাটতির সাথে সম্পর্যুক্ত রোগ হিসেবে  স্বীকৃতি দেয়।

১৭৬৯ সালে উইলিয়াম স্টার্ক নামের একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ৩১ দিন ব্যাপী রুটি ও পানি খাওয়ার পর তিনি একে একে অন্যান্য খাদ্য তার তালিকায় যোগ করেন। খাদ্যতালিকা ছিল মাংস ও স্টার্চপূর্ণ আর সবজি ও সাইট্রাসযুক্ত ফল বর্জিত। ৭ মাস পর সম্ভবত স্কার্ভির কারণে তার মৃত্যু হয়।

স্টার্কের পরীক্ষার ১২ বছর পূর্বে স্কটল্যান্ডের চিকিৎসক জেমস লিন্ড সাইট্রাযুক্ত ফলের প্রতিরোধমূলক শক্তি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এসময় তিনি জাহাজে সার্জন হিসেবে নিয়জিত ছিলেন। তিনি লক্ষ করেন যে, যেসকল রোগী সাইট্রাযুক্ত ফল গ্রহণ করেছিল তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করছিল। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ নাবিকদের লেবুর রস গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে সুপারিশ করে একটি গ্রন্থ লিখেন। ১৯৭৫ সালের দিকে, এ প্রচারের ফলে ব্রিটিশ নাবিকদের লেবুর শরবত ইস্যুকরণ চালু হয় এবং এ রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসে। তবে তখন পর্যন্ত কেউই ভিটামিন 'সি' এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না। এদিকে দুই বিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হোলস্ট ও আল্ফ্রেড ফ্রহ্লিচ পূর্বেই  ভিটামিন  'সি' এর অস্তিত্ব অনুমান করলেও প্রতিনিধির অভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি।

তাহলে পরবর্তীতে কীভাবে আবিষ্কৃত হলো সাইট্রাযুক্ত ফলের সেই গুপ্ত রহস্য ভিটামিন 'সি? এর আবিষ্কারের মূল নায়ক ছিলেন  অ্যালবার্ট জেন্ট গিয়র্গি নামের একজন হাঙ্গেরিয়ান গবেষক। জন্মসূত্রেই একজন বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী গিয়র্গি অল্প বয়স থেকেই বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন।

বুডাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ১ম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ প্রকোপে তার লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটে। তবে থেমে যাননি। যুদ্ধবিরোধী গিয়র্গী যুদ্ধ এড়ানোর জন্য নিজেই নিজেকে আঘাত করেন এবং ১৯১৭ সালে লেখাপড়া শেষ করার জন্য  নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। বিজ্ঞানের প্রতি তার এতই আগ্রহ ছিল যে, তিনি যুদ্ধ এড়াতে রিভলবার দিয়ে নিজ বাহুতে গুলি করেন। তিনি মূলত বৈজ্ঞানিক পেশা শুরু করেন কোষের বিভিন্ন খাদ্য উপাদান গ্রহণ ও দহনের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন পরীক্ষার মাধ্যমে।

এ সময় তিনি অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে একটি অণু আবিষ্কার করেন যেটি হাইড্রোজেনের বাহক ও ৬টি কার্বনের  ধারক এবং চিনি ও এসিডের মতো বৈশিষ্ট্য দেখায়। তিনি এর নামকরণ করেন 'হেক্সইউরনিক এসিড'। এদিকে ১৯২০ সালে উদ্ভিদের শ্বসন ও শক্তি উৎপাদন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, সাইট্রাস রস ব্যবহারের মাধ্যমে  উদ্ভিদের বাদামীকরণ বিলম্বিত করা সম্ভব। তিনি ধারণা করেন, হেক্সইউরনিক এসিড সাইট্রাস  রসে অবস্থান করে। এ থেকে পরবর্তীতে সাইট্রাস রসে থাকা এ এসিড পৃথকীকরণের  পথ সুগম হয়। 

১৯৩০ সালে গিয়র্গি  মেডিসিনাল কেমিস্ট্রির   অধ্যাপক হিসেবে জেগ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি জে. এল. স্মারবেলির সাথে উক্ত এসিডের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করেন। দুই শ্রেণির গিনিপিগ দিয়ে এই পরীক্ষা করা হয় - 

  • শুধুমাত্র সেদ্ধ করা খাবার গ্রহণ করে। 
  •  হেক্সইউরনিক এসিডযুক্ত খাবার গ্রহণ করে এমন প্রাণী
  • ১ম গ্রুপ স্কার্ভি উপসর্গের কারণে মারা যায়। পরবর্তীতে তারা এই এসিডের  নামকরণ করেন 'অ্যাসকরবিক এসিড'। এবার অ্যাসকরবিক এসিডের উৎস অনুসন্ধানের পালা।

১৯৩৩ সালে জেন্ট অ্যাসকরবিক এসিডের  প্রাকৃতিক উৎসের অনুসন্ধান শুরু করেন। কমলা ও লেবুর রসে উচ্চমাত্রায় অ্যাসকরবিক এসিড থাকলেও এর বিশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। তবে কীভাবে বিশোধন করা হলো? একটি মজার ঘটনার মাধ্যমে পরবর্তীতে এ  সমস্যার সমাধান হয়। এক রাতে স্ত্রী তার খাবারে পাপড়িকা পরিবেশন করেন। হঠাৎ তার মনে হয়, পাপড়িকার উপর কখনো পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাই তিনি একে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে পরীক্ষা করেন। ফলস্বরূপ কাকতালীয়ভাবে তিনি এতে  ভিটামিন 'সি' এর নিদর্শন পান।

কয়েক সপ্তাহ পর তিনি ৩ পাউন্ড বিশুদ্ধ অ্যাসকরবিক এসিড প্রস্তত করতে সক্ষম হন। ভিটামিন সি ঘাটতিযুক্ত গিনিপিগদের খাওয়ানোর মাধ্যমে বুুঝতে পারেন, এটি  ভিটামিন সি এর সমতুল্য। ১৯৩৭ সালে এ কাজের জন্য তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় এবং ওয়াল্টার নরম্যান হাওরথ রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান। 


পুড়োটা পড়ুন