ইয়াহুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প

জুলাই ১৭, ২০২১


 ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বর্তমানে ১৪০টিরও বেশি সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে । কিন্তু সেসব ব্যবহার করা তো দূরের কথা, আমরা ক’টারই বা নাম জানি? সার্চ ইঞ্জিন বলতে বেশিরভাগ মানুষ গুগলকেই চিনে থাকে, তবে ইন্টারনেটের সাথে যাদের পুরনো যোগসূত্র রয়েছে এবং দীর্ঘসময় ধরে সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে আসছেন, তারা গুগলের পাশাপাশি ইয়াহুকে রাখতে চাইবেন। কেননা এই সার্চ ইঞ্জিনটিই একসময় নেটের দুনিয়ায় রাজত্ব করেছে।

২০০৫ সালে ইয়াহু ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইটগুলোর মাঝে অন্যতম। আজকে যেমন আমরা গুগলের মেইল বা জিমেইল ব্যবহার করছি, সেসময় প্রায় অধিকাংশ মানুষই ইয়াহু মেইল ব্যবহার করতো। ২০১১ সালে ক'দিনের জন্য শীর্ষস্থানও দখল করে ইয়াহু মেইল। কিন্তু ধীরে ধীরে গুগল যেন ইয়াহুর থেকে সবই ছিনিয়ে নিতে লাগল। অবশেষে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে মার্কিন টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ভেরাইজনের কাছে ৪.৪৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মূল ব্যবসা বিক্রির সম্মতি প্রকাশ করে ইয়াহু। এই চুক্তিকে ফোর্বসের লেখক ব্রায়ান সলোমন প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে দুঃখজনক চুক্তি  হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইয়াহুর পতনের সাক্ষী হয়তো আমরা সবাই, কিন্তু এর গৌরবের দিনগুলো সম্পর্কে কমই জানি। চলুন জানা যাক সেই গল্প।

শুরুর ইতিহাস

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডেভিড ফিলো এবং জেরি ইয়াং এর হাত ধরে ১৯৯৪ সালে ইয়াহু তার যাত্রা শুরু করে। তবে শুরুতে কিন্তু নাম ইয়াহু ছিল না। ডেভিড এবং জেরি তাদের ওয়েবসাইটের নাম দিয়েছিলেন “David and Jerrys guide to the World Wide Web” । '৯৪ সালেরই মার্চ মাসে ওয়েবসাইটটির নাম পরিবর্তন করে 'ইয়াহু' রাখা হয়। সেসময় পুরো ইন্টারনেট জগত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। তাই ওয়েবসাইটটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিলো টেলিফোন ডিরেক্টরির মতো ওয়েবসাইটের একটি ডিরেক্টরি তৈরি করা। সেসময় দুই সদ্য গ্রাজুয়েটের এই ওয়েবসাইট ছিল প্রযুক্তিজগতের বৃহৎ প্রচেষ্টাগুলোর মাঝে অন্যতম।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের পরিচিতি সেভাবে না থাকা সত্ত্বেও নব্বই-এর দশকে ইয়াহু দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৬ সালে ইয়াহুর যখন প্রথম পাবলিক অফারিং হয় তখন এর মূল্য ছিলো প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকলে যে সফল হওয়া সম্ভব ইয়াহু তার চরম একটি উদাহরণ। পরবর্তী দু'বছরে কোম্পানিটির স্টক মূল্য প্রায় ৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৮ সালের মাঝেই ইয়াহুতে যুক্ত হয় ইমেইল, শপিং, গেমস, ট্রাভেলিং, ম্যাপস, ওয়েদার, অনলাইন ম্যাগাজিনসহ নানা সেবা।

ইয়াহুর শেয়ার বাড়তে বাড়তে সেই সালে মোট মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে। ঝড়ের গতিতে যাত্রা শুরু করেছিল ইয়াহু। সার্চ ইঞ্জিন এবং ফ্রি ইমেইল সেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে শীঘ্রই প্রযুক্তিবাজারের শীর্ষস্থানীয় তালিকায় নাম লিখিয়ে নেয় কোম্পানিটি। তবে তখনও গুগল তার যাত্রা শুরু করেনি, কালো ছায়ার দিন যে সামনেই তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

ইয়াহুর সময়গুলো ছিলো তরঙ্গের মতো- কখনো উপরে তো কখনো নিচে। ২০০০ সালে ইয়াহুর মোট মূল্যমান দাঁড়ায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর পরপরই ডট কম সাইটগুলো হুট করেই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এবং মূল্যও অত্যধিক বেড়ে যায়। একে ডট কম ক্রাশ বা Dot com bubble বলা হয়। এসব সাইটের উচ্চমূল্যের কারণে ইয়াহুর মূল্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মাত্র ২ বছরেই ১২৫ বিলিয়ন থেকে ২০০২-এ গিয়ে নেমে যায় ১০ বিলিয়নে, যা অতীত গৌরবের ছায়ামাত্র।

আজকে আমরা যে সেবাগুলোকে প্রাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করি, যেমন- ইউটিউব, ফেসবুক এগুলোর ধারণাও জন্মেছিল ইয়াহু থেকেই। ইউটিউবের মতো একটি প্লাটফর্ম ছিলো Broadcast.com, যা পরবর্তীতে Yahoo TV হিসেবে চালানো হয়। এছাড়া ছিলো ইন্সটাগ্রামের মতো Flickr, Evernote এর মতো Yahoo Notebook এবং Yahoo Music ছিল সেসময়ের Spotify। তবে কোথায় হারিয়ে গেল সেসব?

ভুল সিদ্ধান্তের পাহাড়

ইয়াহুর পতনের পেছনে হয়তো নানা তত্ত্বই দাঁড় করানো যাবে, কিন্তু ইয়াহুর নেয়া সিদ্ধান্তগুলোতে যে ব্যাপক ভুল ছিল এই কথায় সবাই সম্মতি জানাবে। গুগলের আজকের অবস্থানে আসার পেছনেও ইয়াহুর ভুলই দায়ী।

১৯৯৮ সালে স্ট্যানফোর্ডেরই দুজন পিএইচডি শিক্ষার্থী ইয়াহুর কাছে তাদের অ্যালগরিদম বিক্রির জন্য গিয়েছিল। ১ মিলিয়ন ডলারে ঐ অ্যালগরিদম কেনা তখন ইয়াহুর যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। কারা ছিলেন ঐ দুই তরুণ? গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন। তাদের তৈরি পেজর‍্যাঙ্ক অ্যালগরিদমের কারণেই আজ আমরা গুগলে একটি শব্দ লিখলেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেয়ে যাচ্ছি।

গুগল ভালোভাবে প্রতিষ্ঠালাভের পরেও ল্যারি এবং সের্গেই গুগলকে ইয়াহুর কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ইয়াহুর তৎকালীন সিইও টেরি সেমেল তা গায়েই লাগাননি। যখন তার সম্মতি প্রদানের ইচ্ছে হলো তখন গুগলের দাম বেড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে গিয়েছে!

ওই সময়ের আশেপাশেই এক ২২ বছর বয়সী যুবক ইয়াহুর প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, সে ছিল মার্ক জাকারবার্গ। ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ফেসবুককে কিনতে চেয়েছিল ইয়াহু, কিন্তু জাকারবার্গ রাজি হননি।

শুধু কেনার ক্ষেত্রেই নয়, বিক্রির ক্ষেত্রেও ইয়াহু নিয়েছিল ভুল সিদ্ধান্ত। ২০০৮ সালে মাইক্রোসফট ৪৪.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ইয়াহুকে কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে, যা ইয়াহুর বর্তমান মূল্যের চেয়ে ঢের বেশি। কিন্তু তখন সেটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ভুল বিনিয়োগ

১৯৯৯ সালে ইয়াহু দুটি বিখ্যাত অধিগ্রহণ চুক্তি করে, যা প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম দুই বাজে চুক্তি হিসেবে বিবেচিত। এর মাঝে একটি Geocities, এবং আরেকটি Broadcast.com। 

সেসময়ে Geocities ইন্টারনেট বিশ্বে তৃতীয় সর্বাধিক ব্রাউজ করা সাইট ছিল। ১৯৯৯ সালে ইয়াহু ৩.৭ বিলিয়ন ডলারে জিওসিটিসকে কিনে নেয়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটে তাদের নিজেদের হোমপেজ তৈরি করতো। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নতুনত্ব না থাকায় ধীরে ধীরে এটিও তার ব্যবহারকারী হারাতে থাকে এবং ২০০৯ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়।

একই বছরে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস ব্রডকাস্টকে ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় ইয়াহু। পরবর্তীতে ইয়াহু ব্রডকাস্ট থেকে পৃথকভাবে মিউজিক এবং ভিডিও সার্ভিস চালু করে। ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্য সেসময়ের ইন্টারনেট অনেক ধীরগতির ছিল। বলা যায়, ব্রডকাস্ট ছিল সময়ের চেয়ে অগ্রসর। ইয়াহু ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করতে পারলেও ব্রডকাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক কিউবান নাম কামিয়ে নিয়েছিলেন।

২০০৫ সালে ইয়াহু ফটো শেয়ারিং সাইট Flickr-কে ৩০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। তারা একে সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে রুপান্তর করতে চাইলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেখানেও ব্যর্থ হয়। নতুনত্ব না এনে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় সেটিই ছিলো মূল চিন্তা। একই বছরে ইয়াহু আলিবাবার ৪০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। পরবর্তীতে এর কারণেই ইয়াহু দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং এই শতাংশের বর্তমান মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু কেন এত ব্যর্থতা ঘিরে ধরেছিল ইয়াহুকে? কারণ ইয়াহুর কোনো সিইও-ই আদর্শ ছিলেন না। শুরু থেকেই কোম্পানিকে কীভাবে চালানো হবে এ নিয়ে কারোরই স্পষ্ট কোনো দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। তারা না ছিল কোনো সার্চ কোম্পানি, না কোনো টেক কোম্পানি। ইয়াহু ছিল একটি মিডিয়া কোম্পানি যাদের কাছে প্রযুক্তি ছিল লাভ তৈরির একটি ক্ষেত্র। ব্যর্থতার পেছনে সিইও ছাড়াও দায়ী কর্মীরা। অদক্ষ কর্মীতে ভরপুর ছিল ইয়াহু। ফলে কোনো খাতেই নতুনত্ব আনতে তারা সক্ষম হয়নি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইয়াহু ১১৪টি কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছিল, যার একটিও তাদের গৌরব ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

২০১২ সালে ইয়াহুতে সিইও হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক গুগল কর্মী মেলিসা মেয়ার। ইয়াহুর ইতিহাসে এই একজনই পারতেন কোম্পানিকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু মেলিসার আসতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সর্বস্ব হারানো কোম্পানিকে মেলিসাও ঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন এবং শেষপর্যন্ত ২০১৬ সালে ইয়াহুর ইন্টারনেট ব্যবসার ইতি ঘটে এবং কোম্পানির বাকি অংশগুলো নিয়ে Altaba.Inc গঠিত হয়।  

প্রযুক্তির স্রোতের সাথে তাল মিলাতে না পারলে বিলিয়ন ডলার কোম্পানিও যে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে ইয়াহু তার বাস্তব উদাহরণ। ফিলো এবং ইয়াং যা তৈরি করেছেন নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবিদার, কিন্তু তারা ইয়াহুকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। ভুল সিদ্ধান্ত ও বাজে ব্যবস্থাপনাই ইয়াহুর অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছে। ইয়াহুর নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো যেকোনো প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রইবে।


পুড়োটা পড়ুন

একজন নির্জনতম কবি জীবনানন্দ

জুলাই ১৭, ২০২১


কবি বলেছিলেন,
“আমি কবি, সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি
ঝরাপালকের ছবি”
কিছুকালের জন্য তিনি এসেছিলেন এই পৃথিবীতে। বাংলার রূপ দেখে পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাননি তিনি। বাংলার ঘাস, বাংলার বাতাস, বাংলার পাখি, বাংলার শাখী, বাংলার পতঙ্গ, বাংলার বিহঙ্গ তার মন হরণ করেছিল। তিনি ছিলেন নির্জনতার কবি। কবিতায় এঁকেছিলেন অপরূপ প্রকৃতির ছবি। আরেকটি নামে তাকে ডাকা হয়- তিমির হননের কবি।
ফিচার ইমেজ; Image Source : banglanews24
ফিচার ইমেজ; Image Source : banglanews24
হ্যাঁ। জীবনানন্দ দাশের কথাই বলা হচ্ছে। পারিবারিক উপাধি ছিল দাশগুপ্ত। ব্রাহ্ম সমাজে দীক্ষিত হওয়ার পর গুপ্ত-কে কবি নিজেই ছেটে বাদ দিয়েছিলেন।
চরম দারিদ্র্য ও ক্লান্তি তার দেহকে গ্রাস করলেও তার মননকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরিশাল শহরের সত্যানন্দ দাশগুপ্তের ঘর আলো করে এসেছিলেন জীবনানন্দ। মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন একজন বিদূষী, স্বভাবকবিও বটে। আদর করে ছোট্ট জীবনানন্দকে মা ডাকতেন 'মিলু'। সেই মিলু একদিন বাংলা সাহিত্যের এত বড় নক্ষত্রে পরিণত হবে- সে লক্ষণ বাল্যজীবনেই মা বুঝতে পেরেছিলেন।
একদিন সকালে প্রহ্লাদ গোয়ালা দুধ দিতে এসেছিল সত্যানন্দ দাশগুপ্তের বাড়িতে। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে বালক মিলুর ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। মুখ থেকে অবচেতনভাবেই বেরিয়ে এসেছিল,
“আপনি বড় ভালো পড়েন গো, দাদাবাবু”।
গোয়ালা সেই কবিতার মর্মার্থ বুঝতে পারেনি। আবৃত্তির সুন্দরতাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল।
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ; Image Source : thedailystar.net
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ; Image Source : thedailystar.net
আরেকদিনের ঘটনা। তখন ছিল বর্ষাকাল। মিলুদের বাড়ির আঙিনা সবুজ ঘাসে ভরে গিয়েছে। ফকির নামক এক দরিদ্র চাষিকে সত্যানন্দবাবু আঙিনা পরিষ্কার করতে ডাকেন। ফকির সবুজ নির্মল ঘাসের উপর কাস্তে চালাতে থাকে। সে দৃশ্য দেখে কাতরাতে থাকে বালক জীবনানন্দ। সে বয়সেই কয়েক গোছা ঘাসকেও মনের কুঠুরিতে স্থান দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। ফকির সান্ত্বনা দিয়ে তাকে বলেছিল,SIGN UP
“চিন্তা কইরবেন না দাদাবাবু, কিছুদিন পরেই আবার নতুন, সবুজ, কচি ঘাস জন্মাবে”।
কে শোনে কার কথা? ছোট্ট মিলুর কষ্ট যেন কমতেই চায় না।
শিশু জীবনানন্দ ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ত। অসুস্থ জীবনানন্দকে নিয়ে কুসুমকুমারী কোথায় ঘুরে বেড়াননি? কলকাতা থেকে দেওঘর, লক্ষ্ণৌ থেকে আগ্রা, দিল্লী থেকে মাদ্রাজ কোথায় যাননি? মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে এভাবেই পুরো ভারত চষে বেড়িয়েছেন জীবনানন্দ। বাবাকে একটু ভয় পেতেন। সব কথার শেষকথা ছিল বাবার কথা। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন লোকহিতৈষী একজন মানুষ। তাকে সবাই শ্রদ্ধা করত। বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের একজন কর্ণধার ছিলেন তিনি। ছিলেন সুবক্তা ও সুলেখকও। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা ও মননশীলতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। শিশুদের অল্পবয়সে স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে তার দ্বিমত ছিল।
জীবনানন্দকে তাই স্কুলে পাঠানো হয়েছিল একটু দেরিতে। তাই বলে শিক্ষা থেমে থাকেনি। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বাবার উপনিষদ পাঠ আর মায়ের মিষ্টি-মধুর গান শুনে তার দিন শুরু হতো। কুসুমকুমারী দাশ ছন্দে ছন্দে কথা বলতেন। রান্নাঘরে মশলা কুটতে কুটতে লিখেছিলেন 'আদর্শ ছেলে' কবিতাটি। ছোট ছেলে অশোকানন্দের স্কুলের বার্ষিক কবিতা আবৃত্তির জন্য কবিতাটি লিখেছিলেন।
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে..”।
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ; Image Source : Pinterest
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ; Image Source: Pinterest
জীবনানন্দের মধ্যেই হয়তো সেই ছেলেকে খুঁজেছিলেন কুসুমকুমারী দাশ। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দরা ছিলেন সাত ভাই। জীবনানন্দেরা দুই ভাই, এক বোন। ছোট ভাই অশোকানন্দ নয় বছরের ছোট, আর ছোট বোন সুচরিতা দাশ ষোল বছরের। সব মিলিয়ে একান্নবর্তী সংসার। কবির শৈশবের স্মৃতিগুলো ছিল মধুর। লাজুক স্বভাবী, নিভৃতচারী, অল্পভাষী জীবনানন্দকে সবাই পছন্দ করত। পারিবারিক এক উষ্ণ আবহে তার শৈশব কেটেছে।
জীবনানন্দের বরিশালের বাড়ি; Image Source : thedailystar.net
জীবনানন্দের বরিশালের বাড়ি; Image Source : thedailystar.net
শৈশবে প্রকৃতি তাকে যে সৌন্দর্যরূপের প্রতিবেশ দিয়েছে, সেটাই তার পরের কবিত্বের জীবনের সহায়ক ছিল- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ছিল 'ঝরা পালক'। এটি যখন ছাপা হয়, তখন কবির বয়স আটাশ। তিন বছর পর তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ে করেন রোহিণী কুমার গুপ্তের মেয়ে লাবণ্য গুপ্তকে। তাদের দুটি সন্তান হয়েছিল- মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ছেলে সমরানন্দ। জীবনানন্দের বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না। বিয়ের পরও অনেকদিন তাকে বেকার বসে থাকতে হয়েছে। অনেকবার আত্মহননের কথাও ভেবেছেন। তারপর কী মনে করে যেন ফিরে এসেছেন। খুশি থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সমরানন্দের সাথে খেতে বসলেই ছেলের পাতের ডিম নিয়ে কাড়াকাড়ি, স্ত্রী লাবণ্যের সাথে খুনসুটি- এসব তার সুখী থাকার চেষ্টাকেই নির্দেশ করে।
জীবনে সবকিছু খুব সহজভাবে নিতে পারতেন বলেই জীবনানন্দের ছিল আলাদা স্বকীয় এক জগত। শুধুই লিখেছেন। সেই লেখা ছাপাখানায় পাঠিয়ে অর্থ উপার্জনের সাবলীল পন্থাকে তিনি খুব সহজভাবে নিতে পারেননি।
তরুণ জীবনানন্দ; Image Source : wikiwand
তরুণ জীবনানন্দ; Image Source : wikiwand
কাউকে দেখানোর জন্য নয়, তিনি লিখতেন নিজের জন্য। লিখে ট্রাঙ্ক ভর্তি করে রেখে দিতেন। সারা জীবনে তার প্রকাশিত রচনার সংখ্যা বড়জোর তিনশোর মতো হবে। এখন যা পাওয়া যায়, সেগুলো তার মৃত্যুর পরে উদ্ধার করা। একবার ট্রেনে করে ফেরার পথে কবির ট্রাঙ্ক চুরি হয়ে যায়। ট্রাঙ্কের সাথে সাথে হারিয়ে যায় লেখা পাণ্ডুলিপিগুলো। এগুলোর কয়েকটি পরে উদ্ধার করা গেলেও সব যায়নি। সেদিন পৃথিবীবাসী বঞ্চিত হয়েছিল অপ্রকাশিত সেই লেখাগুলো থেকে।
একবার কবি সপরিবারে দিল্লী বেড়াতে যান। ছোট ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে। অশোকানন্দের ঘরে তখন তার সাত বছরের সন্তান অমিতানন্দ। একদিন তারা সবাই মিলে দিল্লী ঘুরতে বের হলেন। ঘুরতে ঘুরতে অমিতানন্দ বড়দিদি মঞ্জুশ্রীর হাতের বালা হারিয়ে ফেলে। এতে জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দেবী ও অশোকানন্দের স্ত্রী নলিনী দেবী ছোট্ট অমিতানন্দকে বকাঝকা করেন। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই কবির। তিনি আপন মনে আত্মভোলা হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছেন সবকিছু। সেদিন নলিনী দেবী জীবনানন্দের একটি ছবি তুলে দেন। সেই ছবিই এখন বই-পত্তর, পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়।
দিল্লীর রাজঘাটে সপরিবারে জীবনানন্দ দাশ, (বা দিক থেকে) স্ত্রী লাবণ্য দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ভাইপো অমিতানন্দ ও ছেলে সমরানন্দ; Image Source : billwa90.blogspot.net
দিল্লীর রাজঘাটে সপরিবারে জীবনানন্দ দাশ, (বাঁ দিক থেকে) স্ত্রী লাবণ্য দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ভাইপো অমিতানন্দ ও ছেলে সমরানন্দ; Image Source: billwa90.blogspot.net
জীবনানন্দ ও তার লেখা সেসময় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। তার সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন সজনীকান্ত দাশ। সজনীকান্ত তাঁর শনিবারের চিঠি-তে জীবনানন্দের লেখার ব্যঙ্গাত্মক ও কড়া সমালোচনা করতেন। সমালোচনা করে সজনীকান্ত লিখেছিলেন ‘গণ্ডারমারী কবিতা'। একবার লিখেছিলেন,
“জীবনানন্দের লেখা নির্জন পেঁচার মতো প্রাণ যদি অলৌকিক না হয় তবে সীতার পাতাল প্রবেশও অলৌকিক নয়”।
এত্তসব সমালোচনার শরকে উপেক্ষা করে জীবনানন্দ মুচকি হেসে বলেছিলেন,
“সজনীকান্তবাবু তো আমার ভালোই প্রচার করছেন”।
জীবনানন্দের প্রিয় শহর ছিল কলকাতা। কলকাতার আবহে তিনি ছিলেন মোহাচ্ছন্ন। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের চাকরি ছাড়ার পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। বাগেরহাটের কলেজে চাকরিরত অবস্থায়ও ছুটি পেলেই কলকাতায় চলে যেতেন। কলকাতায় কবি কখনও মেসে ছিলেন, কখনও ছিলেন অশোকানন্দের বাড়িতে; আর একটু দীর্ঘ সময় ছিলেন ল্যান্সডাউনের এক ভাড়াবাড়িতে। এই কলকাতাতেই কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
যেদিন ট্রামের দুর্ঘটনাটি ঘটে, তার আগের দিন রেডিও-তে আবৃত্তি করেছিলেন ‘মহাজিজ্ঞাসা’ কবিতাটি। দুর্ঘটনার দিন সকালেও বন্ধুদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিন বিকেলেও হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। দুই থোকা ডাবও কিনেছিলেন। দু'হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, এমন সময় ঘাতক ট্রামটি কবির উপর চড়ে বসে। গুরুতর আঘাত পান তিনি। কণ্ঠ, উরু ও পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়।
তার চিৎকার শুনে পাশের চায়ের দোকানদার চুনিলাল ও অন্যরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। ড. ভূমেন্দ্র গুহ সহ অনেক কবি-সাহিত্যিক তার প্রাণ বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেন। সজনীকান্ত দাশ তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়কে অনুরোধ করেন কবিকে দেখার জন্য। বিধান রায় সে অনুরোধ রেখেছিলেন। যমে-মানুষে আটদিনের লড়াই চলে। তারপর সব স্থির হয়ে যায়। জীবনানন্দ তার প্রিয় বাংলা, কলকাতাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তিটি ছিল,
“ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে”।

পুড়োটা পড়ুন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নাকি সমাজ থেকে বের হওয়ার পথ!

জুলাই ১৬, ২০২১


সকালে আপনার বাসায় বা আশেপাশে প্রতিদিন যে লোকটি পত্রিকা দিয়ে যায়, তার সাথে আপনার পরিচয় কেমন? এলাকায় রাস্তার মোড়ে যে লোকটি ফুচকা বিক্রি করে তার সাথে কি আপনার কথোপকথন হয়? আজকের সমাজে অনেকেরই হয়ত এসবের উত্তর হবে ‘না’। আমরা সবাই স্মার্টফোনের সাথে দারুনভাবে যুক্ত। বর্তমান সময়ের তথ্য প্রযুক্তির অন্যতম ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় একটি অংশ হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। আর আধুনিক ইন্টারনেট এর সহজলভ্যতার খাতিরে সবারই ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম সহ আরো নানাবিধ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর এসবের পিছে ঝোঁকার জন্য আমাদের কাছে দারুন একটি কারন থাকে যা হল; সামাজিক হওয়া, সমাজের সাথে যুক্ত হওয়া। তবে আদৌ সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের ভিতর কতটুকু  মূল্যবোধের উন্নতি করে সামাজিক আদর্শ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, নাকি সামাজিক মূল্যবোধ এর বিকৃতি ঘটিয়েছে তা ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ স্মার্টফোন এবং আজকের শিশু


আপনি বাসার ওয়াটারপাম্পকে একটি পানি তোলার মেশিনই বলবেন, আবার রান্নাঘরের রেফ্রিজারেটরকে খাবার ঠাণ্ডা করার যন্ত্রই বলবেন। তবে মোবাইল তথা স্মার্টফোনকে কেবল একটি যন্ত্র বা ডিভাইস বললে ভুল হবে! কেননা বর্তমান পৃথিবীতে স্মার্টফোন  আমাদের  জীবনের অবিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত হয়েছে। কোথাও কারো জন্য অপেক্ষা করার সময়, বাসায় নিজের পরিবারের সাথে বসে থাকার সময়, এমনকি কাজে ফাঁকি দেয়ার সময়েও; আমরা কখন স্মার্টফোনটা খুলে এই ভার্চুয়াল সমাজের ভেতর থাকিনা? বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন এবং কম্পিউটিং ডিভাইসের কল্যাণে একটি অন্ধকারাবৃত সমাজের সূচনা শুরু হয়েছে।


সামাজিক মাধ্যমগুলো মানুষের ভেতর একটি অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুন এমনকি শিশু-কিশোরদের ভেতর একটি নেতিবাচক অভ্যাস তৈরি হয়েছে, যা হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর ফোন চেক করার প্রবনতা। আশেপাশে কথা বলার মত, সময় কাটানোর মত অনেক মানুষ থাকলেও এই ফোন চেক করার প্রবনতা তখনও বিদ্যমান থাকে, যার কারনে একে বলা হচ্ছে নেতিবাচক অভ্যাস। একটা বিষয় মানতে হবে যে, কোন একটি সামাজিক মাধ্যমে আপনার হাজার বন্ধু থাকলেও তা আপনার বাস্তব জীবনের একজন বন্ধুর সমান হবে না। তবে আমরা অনেকে এখন ভার্চুয়াল সম্পকর্কে বাস্তবের সাথে তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছি, যেখানে সামান্য রিয়েক্ট বাটনে চাপার হেরফের হলেও মানুষের ভেতর অনেক ভুলবোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। 


বর্তমান তরুন সমাজ তথ্য প্রযুক্তির দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই কথা আমরা বলতে পারি। তবে এখনও দেশের বহু তরুন সমাজের এই তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এর সীমা কেবল এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্তই। ব্যাপারটা এরকম নয় যে, তারা সামাজিক মাধ্যম অলগরিদম কিভাবে কাজ করে এবং একে ব্যবহার করে কিভাবে নানাক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাপনকে সহজ করা যায় তা নিয়ে ভাবছেনা। বরং তাদের বেশিরভাগই সামাজিক মাধ্যম নিয়ে ভাবে যে, তারা এতে আদৌ কতোটা পরিচিত, সে সামাজিক মাধ্যমে অবহেলা(ইগনর) এর স্বীকার হচ্ছে কিনা, সামাজিক মাধ্যমে তাকে কতজন চেনে এসব।


এই মাধ্যমটি পরিণত হয়েছে একটি মঞ্চে; যে মঞ্চে কে কতোটা বেশি অনন্য এবং আধুনিক তা তুলে ধরতে ব্যাস্ত। যেকোনো মানুষ মনের অজান্তেই এখানে নিজেদেরকে অন্যদের সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। স্কুলে পড়ুয়া একজন ছেলে যখন সামাজিক মাধ্যমে তার বন্ধুর জাকজমকপূর্ণ ছবি দেখে নিজেকে তার মত হওয়ার কল্পনা করবে, তখন তার এই ইচ্ছা পূরণের দাবি চাপবে ছেলেটির বাবা-মার উপর। আর বর্তমান সময়ের এক শ্রেণির কিশোর কিশোরীদের আভিজাত্য যাপন, পশ্চিমা সভ্যতার সাথে নিজেদের তুলনা করে তাদের মত করে চলা, তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের প্রদর্শন করা, যা কে বলা হয় শো-অফ, তা যেন একরকম করে বর্তমান সামাজিক মাধ্যমের নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পুড়োটা পড়ুন

ভিটামিন সি এর আবিষ্কার

জুলাই ১৬, ২০২১

 কয়েক শতাব্দী আগে, জাহাজে অবস্থানরত নাবিকেরা মুখে ঘা, ত্বকের রক্তক্ষরণ, ক্ষতস্থানের ধীরগতিতে নিরাময়সহ বিভিন্ন উপসর্গে ভোগে। এর ফলে অনেকের মৃত্যু ঘটে। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধের ইতিহাসে নাবিকদের এ রোগে ভোগার ও মৃত্যুর হার ছিল ব্যাপক। কুলম্বের আটলান্টিক সমুদ্রযাত্রা ও স্টিম ইঞ্জিন উৎপত্তির মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২ মিলিয়ন নাবিক এ রোগে ভোগে। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ভাস্কো- ডা-গামা, ম্যাগালান, জর্জ অ্যানসন প্রমুখও এ রোগের কবল থেকে রেহাই পাননি।



কী ছিল এ রোগের কারণ? প্রকৃতপক্ষে জাহাজিদের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন 'সি' এর সরবরাহ কম হওয়ায় তারা স্কার্ভিতে ভোগে। ১৭৫৩ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল কমিউনিটি  এ রোগকে বিশদভাবে খাদ্যতালিকাগত ঘাটতির সাথে সম্পর্যুক্ত রোগ হিসেবে  স্বীকৃতি দেয়।

১৭৬৯ সালে উইলিয়াম স্টার্ক নামের একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ৩১ দিন ব্যাপী রুটি ও পানি খাওয়ার পর তিনি একে একে অন্যান্য খাদ্য তার তালিকায় যোগ করেন। খাদ্যতালিকা ছিল মাংস ও স্টার্চপূর্ণ আর সবজি ও সাইট্রাসযুক্ত ফল বর্জিত। ৭ মাস পর সম্ভবত স্কার্ভির কারণে তার মৃত্যু হয়।

স্টার্কের পরীক্ষার ১২ বছর পূর্বে স্কটল্যান্ডের চিকিৎসক জেমস লিন্ড সাইট্রাযুক্ত ফলের প্রতিরোধমূলক শক্তি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এসময় তিনি জাহাজে সার্জন হিসেবে নিয়জিত ছিলেন। তিনি লক্ষ করেন যে, যেসকল রোগী সাইট্রাযুক্ত ফল গ্রহণ করেছিল তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করছিল। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ নাবিকদের লেবুর রস গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে সুপারিশ করে একটি গ্রন্থ লিখেন। ১৯৭৫ সালের দিকে, এ প্রচারের ফলে ব্রিটিশ নাবিকদের লেবুর শরবত ইস্যুকরণ চালু হয় এবং এ রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসে। তবে তখন পর্যন্ত কেউই ভিটামিন 'সি' এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না। এদিকে দুই বিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হোলস্ট ও আল্ফ্রেড ফ্রহ্লিচ পূর্বেই  ভিটামিন  'সি' এর অস্তিত্ব অনুমান করলেও প্রতিনিধির অভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি।

তাহলে পরবর্তীতে কীভাবে আবিষ্কৃত হলো সাইট্রাযুক্ত ফলের সেই গুপ্ত রহস্য ভিটামিন 'সি? এর আবিষ্কারের মূল নায়ক ছিলেন  অ্যালবার্ট জেন্ট গিয়র্গি নামের একজন হাঙ্গেরিয়ান গবেষক। জন্মসূত্রেই একজন বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী গিয়র্গি অল্প বয়স থেকেই বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন।

বুডাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ১ম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ প্রকোপে তার লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটে। তবে থেমে যাননি। যুদ্ধবিরোধী গিয়র্গী যুদ্ধ এড়ানোর জন্য নিজেই নিজেকে আঘাত করেন এবং ১৯১৭ সালে লেখাপড়া শেষ করার জন্য  নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। বিজ্ঞানের প্রতি তার এতই আগ্রহ ছিল যে, তিনি যুদ্ধ এড়াতে রিভলবার দিয়ে নিজ বাহুতে গুলি করেন। তিনি মূলত বৈজ্ঞানিক পেশা শুরু করেন কোষের বিভিন্ন খাদ্য উপাদান গ্রহণ ও দহনের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন পরীক্ষার মাধ্যমে।

এ সময় তিনি অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে একটি অণু আবিষ্কার করেন যেটি হাইড্রোজেনের বাহক ও ৬টি কার্বনের  ধারক এবং চিনি ও এসিডের মতো বৈশিষ্ট্য দেখায়। তিনি এর নামকরণ করেন 'হেক্সইউরনিক এসিড'। এদিকে ১৯২০ সালে উদ্ভিদের শ্বসন ও শক্তি উৎপাদন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, সাইট্রাস রস ব্যবহারের মাধ্যমে  উদ্ভিদের বাদামীকরণ বিলম্বিত করা সম্ভব। তিনি ধারণা করেন, হেক্সইউরনিক এসিড সাইট্রাস  রসে অবস্থান করে। এ থেকে পরবর্তীতে সাইট্রাস রসে থাকা এ এসিড পৃথকীকরণের  পথ সুগম হয়। 

১৯৩০ সালে গিয়র্গি  মেডিসিনাল কেমিস্ট্রির   অধ্যাপক হিসেবে জেগ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি জে. এল. স্মারবেলির সাথে উক্ত এসিডের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করেন। দুই শ্রেণির গিনিপিগ দিয়ে এই পরীক্ষা করা হয় - 

  • শুধুমাত্র সেদ্ধ করা খাবার গ্রহণ করে। 
  •  হেক্সইউরনিক এসিডযুক্ত খাবার গ্রহণ করে এমন প্রাণী
  • ১ম গ্রুপ স্কার্ভি উপসর্গের কারণে মারা যায়। পরবর্তীতে তারা এই এসিডের  নামকরণ করেন 'অ্যাসকরবিক এসিড'। এবার অ্যাসকরবিক এসিডের উৎস অনুসন্ধানের পালা।

১৯৩৩ সালে জেন্ট অ্যাসকরবিক এসিডের  প্রাকৃতিক উৎসের অনুসন্ধান শুরু করেন। কমলা ও লেবুর রসে উচ্চমাত্রায় অ্যাসকরবিক এসিড থাকলেও এর বিশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। তবে কীভাবে বিশোধন করা হলো? একটি মজার ঘটনার মাধ্যমে পরবর্তীতে এ  সমস্যার সমাধান হয়। এক রাতে স্ত্রী তার খাবারে পাপড়িকা পরিবেশন করেন। হঠাৎ তার মনে হয়, পাপড়িকার উপর কখনো পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাই তিনি একে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে পরীক্ষা করেন। ফলস্বরূপ কাকতালীয়ভাবে তিনি এতে  ভিটামিন 'সি' এর নিদর্শন পান।

কয়েক সপ্তাহ পর তিনি ৩ পাউন্ড বিশুদ্ধ অ্যাসকরবিক এসিড প্রস্তত করতে সক্ষম হন। ভিটামিন সি ঘাটতিযুক্ত গিনিপিগদের খাওয়ানোর মাধ্যমে বুুঝতে পারেন, এটি  ভিটামিন সি এর সমতুল্য। ১৯৩৭ সালে এ কাজের জন্য তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় এবং ওয়াল্টার নরম্যান হাওরথ রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান। 


পুড়োটা পড়ুন

আইকিউ এর ইতিবৃত্ত: সত্যিই মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্দেশ করে?

জুলাই ১৬, ২০২১



আইকিউ এর ইতিবৃত্ত

১৮৮২ সালে ব্রিটিশ পরিসংখ্যানবিদ ফ্রান্সিস গাল্টন প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা নির্ণয়ের জন্য কিছু সাধারণ পরীক্ষা তৈরি করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফ্রান্সের একটি স্কুলে কোন কোন শিক্ষার্থীদের বিশেষ যত্ন দরকার, এটি ঠিক করার জন্য কর্তৃপক্ষ মনোবিদ আলফ্রেড বিনে এবং থিওডর সাইমনের শরণাপন্ন হয়। ১৯০৫ সালে আলফ্রেড বিনে এবং থিওডর সাইমন মস্তিষ্কের বিকাশের কিছু প্রকাশমাধ্যম যেমন মৌখিক যুক্তি, কাজের স্মৃতিশক্তি এবং চাক্ষুষ-স্থানিক দক্ষতা ইত্যাদি যাচাই করার জন্য বেশ কিছু পরীক্ষামালা উদ্ভাবন করেন এবং প্রাপ্ত ফলাফলকে স্কোরিং করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

প্রতিটি বয়সের শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নমালা তৈরি করে দেখা হয় যে, শিশুটি তার বয়সের বাকি শিশুদের থেকে বেশি, সমান না কম বুদ্ধিমান। তাদের উদ্ধাবিত পদ্ধতিটি বিনে-সিমন টেস্ট নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। এরপর স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এল. এম. টারম্যান ১৯১৬ সালে বিনে-সিমন টেস্টকে কিছুটা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করেন, যা স্ট্যানফোর্ড-বিনে ইন্টেলিজেন্স স্কেল নামে পরিচিতি পায়। এই টেস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং বুদ্ধিমত্তা পরিমাপক পদ্ধতি হিসেবে অদ্বিতীয় মর্যাদা পায়। এর আগে ১৯১২ সালে জার্মান মনোবিদ উইলিয়াম স্টার্ন Intelligence এবং Quotient শব্দজোড়া থেকে IQ শব্দটি তৈরি করেন, যা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শব্দ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।


আইকিউ পরীক্ষার অন্ধকার অধ্যায়

যদিও আইকিউ টেস্ট ফ্রান্সের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রথম তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হতে হতে অনেকটাই মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিচারের একমাত্র মাধ্যমে পরিণত হয়। আইকিউ ধীরে ধীরে মানুষকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করার মাধ্যমেও পরিণত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনাবাহিনীর নিয়োগের সময় বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা হিসেবে এ পরীক্ষার ব্যবহার করে। সেই সময় অনেক বিজ্ঞানী এবং রাজনীতিবিদরা ইউজেনিকস মতবাদে বিশ্বাস করতেন। ইউজেনিকস অনুযায়ী, যেসব মানুষ পশ্চিমাদের চোখে অধিকতর সুন্দর, বুদ্ধিমান (অর্থাৎ তারা নিজেরা)- তাদের মধ্যেই প্রজনন প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রেখে মানবজাতির মধ্যে একটি বিশুদ্ধ জাতি তৈরি করা।

মতবাদ পুরো পৃথিবীতেই গণহত্যা এবং জাতিগত বিশুদ্ধিকরণকে উৎসাহিত করে। ইউজেনিকসের সমর্থকরা আইকিউ টেস্টকে বুদ্ধিমত্তার পরিমাপক হিসেবে ধরত। স্বভাবতই তারা সেসময় প্রথাগত পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার কারণে আইকিউ টেস্টে ভালো করত এবং একসময় তারা সেটিকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু করল। এমনকি ১৯২৪ সালে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে কম আইকিউধারী মানুষদের সন্তান গ্রহণে অক্ষম করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল, যা পরে আদালত পর্যন্ত গড়ালে আদালতও সে সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ঘোষণা করে।

ভার্জিনিয়ায় ১৯২৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত নিম্ন আইকিউ'র অজুহাতে প্রায় ৭,০০০ লোককে বিভিন্নভাবে প্রজননে অক্ষম করা হয়। ধীরে ধীরে এর হার কমে আসে এবং ২০০১ সালে এটিকে বর্ণবাদী আখ্যায়িত করে ভার্জিনিয়া। নাৎসি শাসিত জার্মানিতে কম আইকিউ সম্পন্ন শিশুদের হত্যার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রভাবে আইকিউ বিচার করে মানুষকে শ্রেণিভুক্ত করা কমে আসে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেখা যায়, সামগ্রিকভাবেই মানুষের গড় আইকিউ বেড়েছে। কিন্তু এর কারণ হিসেবে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ নয়, বরং জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন দায়ী বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন। এই ঘটনাটিকে ফ্লিন ইফেক্ট বলা হয়।

আইকিউ কি সত্যিই মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্দেশ করে?

আইকিউ টেস্ট এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যা মানুষের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সাধারণ জ্ঞান, গাণিতিক যুক্তি, স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিগত বিশ্লেষণ ক্ষমতা ইত্যাদি বিচার করে ফলাফল নির্ধারণ করে। কিন্তু বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র এ ক'টি বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, আবেগ কিংবা সামাজিক বুদ্ধিমত্তা আইকিউ দিয়ে বিচার করা যায় না। আবার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সচেতনতা, স্বকীয়তা, আধ্যাত্মিক বোধ ইত্যাদি আইকিউ দিয়ে বিচার করা হয় না। কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব বিকাশ এবং প্রায়োগিক মনোবিদ্যার অধ্যাপক স্ট্যানোভিচের মতে, আইকিউ পরীক্ষাকে এককভাবে গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। তার মতে, আইকিউ পরীক্ষাগুলো কিছু মানসিক অনুষঙ্গকে পরিমাপ করার ক্ষেত্রে খুব ভালো; যেমন- যুক্তি, বিমূর্ত যুক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং কর্ম-স্মৃতি ক্ষমতা সহ মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা ইত্যাদি।

কিন্তু, বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এটি কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরো বলেন, আইকিউ পরীক্ষাগুলো মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিমাপ করে এবং সেটি মোটামুটিভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মজীবনে সাফল্যের পূর্বাভাস দিতে পারে। তবে সে পূর্বাভাস অসম্পূর্ণ এবং ততটা ভরসার যোগ্য না-ও হতে পারে। স্বাস্থ্যকর মানবিক চিন্তাশৈলী এবং মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ দক্ষতা আইকিউ দ্বারা বিচার করাই যথেষ্ট নয়। তাই বুদ্ধিমত্তা নির্ণয়ে আইকিউ টেস্টই সবকিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পুড়োটা পড়ুন

দক্ষিণ চীন সাগর : আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু যে অঞ্চল

জুলাই ১৬, ২০২১


১৯৩৭ সালে জাপান আক্রমণ করে চীনকে। তখন দক্ষিণ চীন সাগরের বেশ কিছু অঞ্চল চলে যায় জাপানের অধীনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পন করলে চীন তাদের হারানো অঞ্চল ফিরে পায়। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন রিপাবলিক অব চায়নার জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনট্যাং চীনের নতুন একটি মানচিত্র প্রকাশ করে। এতে চীনের মূল ভূখণ্ডের নিচে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর এগারোটি ড্যাশ লাইন আঁকা হয়। একে বলা হতো ‘ইলিভেন ড্যাশ লাইন’।  
১৯৪৯ সালে চীনে গৃহযুদ্ধের অবসান হলে ক্ষমতায় আসে মাও সে তুং এর চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। তারা গঠন করে পিপল’স রিপাবলিক অব চায়না। অন্যদিকে কুওমিনট্যাং পালিয়ে চলে যায় তাইওয়ানে। কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫৩ সালে ইলিভেন ড্যাশ লাইনকে আরেকটু সরলীকরণ করে নয়টি ড্যাশ লাইন আঁকে। একে বলা হয় ‘নাইন ড্যাশ লাইন’।

চীনের বিতর্কিত 'নাইন ড্যাশ লাইন'; Image Source: CNBC/Youtube

চীন এই নাইন ড্যাশ লাইনের মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় নব্বই ভাগ অঞ্চল নিজেদের দাবি করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই অঞ্চল তাদের ঐতিহাসিক অধিকার। কারণ, কিং রাজবংশ ও অন্যান্য শাসনামলে এসব অঞ্চল চীন থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। অন্তত চীনের দাবি এমনই। চীনে ছাপা হওয়া সব মানচিত্র, গুগল ম্যাপের চীনা সংস্করণ বাইডু ম্যাপ, চীনা পাসপোর্ট সব জায়গায় চীনের মানচিত্রে নাইন ড্যাশ লাইন যোগ করা।
তবে চীনের এই দাবি এই অঞ্চলের আরো পাঁচটি দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা হচ্ছে ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও ফিলিপাইন। চীনের নাইন ড্যাশ লাইনে এসব দেশেরও কিছু অঞ্চল চলে এসেছে। এর মাঝে তাইওয়ানকে তো চীন নিজেদেরই প্রদেশ মনে করে। আবার, ফিলিপাইনে গিয়ে আপনি দক্ষিণ চীন সাগর বলে কিছু পাবেন না। কারণ, তাদের কাছে এই সাগরের নাম পশ্চিম ফিলিপাইন সাগর

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ানো একাধিক দেশ; Image Source: Forbes

বোঝাই যাচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে এই অঞ্চলে চলছে গভীর সংকট। এই সংকট গত কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। আজও তার সমাধান হয়নি। শুধু এই ছয়টি দেশই নয়, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এই অঞ্চলে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশংকায় আছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই অঞ্চল নিয়ে আগে শুধু অ্যাকাডেমিক দিক দিয়েই দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে চীন এই অঞ্চলে সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করা শুরু করেছে। কেন এত সংকট এই অঞ্চল নিয়ে? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল?   

দক্ষিণ চীন সাগর সংকট

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক অঞ্চল নিজেদের দাবি করতে পারে। তাছাড়া ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন। এই অঞ্চলে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ আরোহন, জলজ প্রাণী বা মৎস্য আরোহন, কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ ইত্যাদির স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। চীনের নাইন ড্যাশ লাইন অনুযায়ী, তারা মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার সামুদ্রিক অঞ্চল নিজেদের দাবি করছে। এই অঞ্চলে রয়েছে বেশ কিছু দ্বীপপুঞ্জ। যেমন- স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, স্কারবরো শোল অঞ্চল, প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জসহ বেশ কিছু প্রবাল দ্বীপ।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধিতায় জড়িত দেশগুলোর দাবিকৃত অঞ্চল; Image Source: Inquiries Journal

বর্তমানে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের ২১টি দ্বীপ ভিয়েতনামের অধীনে রয়েছে। তারা ১৯৮৮ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে সাউথ জনসন রীফ অঞ্চল হারায়। ভিয়েতনাম দাবি করে, স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ২০০ নটিকেল মাইলের মধ্যে। সুতরাং, জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ তাদের। ১৯৭৫ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একীভূত হয়ে যায়। তারপর থেকে তারা দাবি করছে প্যারাসেল দ্বীপও তাদের। যদিও ১৯৫৮ সালে উত্তর ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী এই অঞ্চলকে চীনের অধীনে বলেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
ফিলিপাইন জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী ও ঐতিহাসিক দাবির প্রেক্ষিতে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ ও স্কারবরো শোল অঞ্চল নিজেদের মনে করে। এই অঞ্চল নিয়ে ফিলিপাইনের সাথে চীনের দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। চীন এই অঞ্চলে তাদের পতাকা টানিয়ে রাখলে ফিলিপাইনিরা সেগুলো তুলে ফেলে। চীন সন্দেহ করে ফিলিপাইনিরা সমুদ্রে মাছ ধরার নামে চীনের ওপর নজর রাখছে।
জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী, ব্রুনাইয়ের দাবি স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের লুইসা রীফ অঞ্চল তাদের। মালয়েশিয়াও তাদের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের দাবি করছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের দাবি চীনের মতোই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাইওয়ানের জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনট্যাংই চীনের ড্যাশ লাইন ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল।

দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব

দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক অঞ্চল। এই অঞ্চল এশিয়ার সাথে আফ্রিকা ও ইউরোপের যোগাযোগ রক্ষা করছে। তাই এই অঞ্চল বাণিজ্যক ও সামরিক দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের সমাহার। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলে ১১ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ রয়েছে।
তবে চীন সরকারের অধীনের এক কোম্পানির তথ্যানুযায়ী, সেখানে প্রকৃতপক্ষে ১২৫ বিলিয়ন গ্যালন তেল ও ৫০০ ট্রিলিয়ন ঘন ফুট প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। চীন প্রতিবছর ৪.৫ বিলিয়ন গ্যালন তেল ব্যবহার করে। সুতরাং, এই অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা কয়েক দশকের খনিজ শক্তির যোগান পাবে।

দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে মজুদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ; Image Source: CNBC/Youtube

তাছাড়া দক্ষিণ চীন সাগর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর সেখানে ৩.৩৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য জাহাজে বহন করা হয়। ২০১৬ সালে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের শতকরা ৩০ ভাগ পরিবহণ করা হয় এই অঞ্চল দিয়ে। চীনের আমদানিকৃত তেলের শতকরা আশি ভাগ ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা প্রণালী দিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে।
এছাড়া এই অঞ্চলে বিশ্বের শতকরা দশ ভাগ মৎস্য সংগ্রহ করা হয়। তাই এই অঞ্চল লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্যের উৎসও।
গত ৭০ বছরে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের সার্বভৌমত্ব দাবি করা দেশগুলো কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের চেষ্টা করছিল। এই অঞ্চলে পাহারা দেয়ার কাজ হতো নৌবাহিনী ও কিছু অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পের মাধ্যমে। সামরিক কার্যক্রম না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সেনা ক্যাম্প তৈরির মতো প্রয়োজনীয় ভূমির অভাব। তবে চীনে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই চিত্র পাল্টে গেছে।
২০১৪ ও ২০১৫ সালের মধ্যে চীন এই অঞ্চলে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা শুরু করেছে। তারা সাতটি দ্বীপে সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। দ্বীপগুলো হচ্ছে সুবি রিফ, মিশচিফ রিফ, জনসন সাউথ রিফ, হিউজেস রিফ, গেভেন রিফ, ফিয়েরি ক্রস রিফ ও কোয়ারটেরন রিফ। চীন অবশ্য বলে তারা সামরিকায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে এসব করছে না।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশে চীনের নির্মাণাধীন কৃত্রিম দ্বীপ; Image Source: Digital Globe/AFP/Getty Images

স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের ফিয়েরি ক্রস রিফে চীন ৩.১ কিলোমিটার এয়ারস্ট্রিপ নির্মাণ করেছে। এতে যেকোনো চীনা সামরিক বিমান এখানে অবতরণ করতে পারে। এছাড়া এখানে বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে যেন মূল ভূখণ্ড থেকে সামরিক ট্যাংক নিয়ে আসা যায়। সুবি রিফ দ্বীপকেও চীন স্থায়ী সামরিক আস্তানা বানিয়ে ফেলেছে। এর মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরেই থিটু রিফে ফিলিপাইনের সেনারা ঘাঁটি বানিয়েছে। এছাড়া মিশচিফ রিফে দ্বীপ নির্মাণ নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের জনগণের বিক্ষোভের ঘটনাও আছে।
এই অঞ্চল নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও তারা সবাই-ই চায় এখানে মুক্তভাবে নৌযান চলাচল করুক। কারণ, এতে সব দেশেরই ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে। চীন ব্যবসায়িক দিকের পাশাপাশি চাইছে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের করে নেয়ার। কারণ, এতে তারা জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী হতে পারবে। একইসাথে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের সুপার পাওয়ার হওয়ার দিকেও অনেকখানি এগিয়ে যাবে। এই উদ্দেশ্যেই ২০১৩ সাল থেকে প্রায় ৩,২০০ একর জায়গা দখল করে নিয়েছে চীন।
কিন্তু অন্য দেশগুলো চীনের এই আগ্রাসনকে ভালো চোখে দেখছে না। ফিলিপাইন ২০১৩ সালে নেদারল্যান্ডের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালতে চীনের বিরুদ্ধে মামলা করে। এর রায় হয় ২০১৬ সালে। আদালত রায় দেয় চীনের বিপক্ষে। চীনের নাইন ড্যাশ লাইন ও ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি অযৌক্তিক মনে হয় আদালতের কাছে। তবে চীন এই রায় প্রত্যাখ্যান করে। তারা বরং দ্বীপাঞ্চলগুলো আরো দখলে মনোযোগ দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

চীনের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে যে দেশগুলো আছে তাদের বন্ধু রাষ্ট্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকায় যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবেই দেখে একে।

চীনের আগ্রাসনের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই তাদের যুদ্ধ জাহাজ প্রদর্শনী করে দক্ষিণ চীন সাগরে; Image Source: US Navy

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই অঞ্চলে মুক্ত নৌযান চলাচল নিশ্চিত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যও প্রয়োজন। তাই তারা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নিরসনে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই এখানে কাজ করে। সামরিক অস্ত্রে সুসজ্জিত নৌবহর নিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র মহড়া দেয়। চীন যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই নাক গলানো মনোভাবের জন্য বারবার সতর্ক করছে তাদের।

সংকট উত্তরণের সম্ভাব্য উপায়

সংকট যেমন জটিল, তা উত্তরণের উপায়ও আছে। এজন্য দরকার দ্বন্দ্বে জড়িত প্রতিটি দেশের সদিচ্ছা। তারা যদি এই অঞ্চলের সম্পদ উৎপাদনে একে অন্যকে সহযোগিতা করে ও নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়, তাহলে এই সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। প্রাকৃতিক গ্যাস, মৎস্য আরোহণ, তেল উৎপাদনে প্রত্যেকে সহযোগিতা মনোভাবে কাজ করলে অবৈধ কার্যক্রমও কমে যাবে। তারা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও একত্রে কাজ করতে পারে।
তারা নিজেদের সামরিক বাহিনীর সংলাপের মাধ্যমেও সংকট উত্তরণে কাজ করতে পারে। বড় কোনো সংঘাত এড়ানোর জন্য প্রতিটি দেশ নিজেদের মধ্যে হটলাইন নির্মাণ করতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে পারে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই হয়তো মধ্যস্থতা করতে আসবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বিরোধিতা থাকায় আসিয়ান বা সিঙ্গাপুরের মতো নিরপেক্ষ দেশগুলোও ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য কূটনৈতিক আলোচনা যে হচ্ছে না, তা নয়।

শেষকথা

শান্তিপূর্ণ আলোচনায় সমাধান না হলে একসময় হয়তো যুদ্ধের দিকেই গড়াবে এই সংকট। সেটা হতে পারে একে অন্যকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কয়েক দশক ধরে চলা এই সংকট হয়তো খুব দ্রুতই সমাধানের নিশ্চয়তা নেই। বরং, চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সুপার পাওয়ার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সংকট আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরেই যে সংকট তা নয়। উত্তর চীন সাগরেও চীনের সাথে জাপানের কয়েক দশক ধরে একটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সহসাই এসব সংকট সমাধানের লক্ষণ নেই।

পুড়োটা পড়ুন