জেলে শহর থেকে আজকের দুবাই

  কোন মন্তব্য নেই

দুবাই, আজ থেকে ৬০ বছর আগে যা একটি গ্রাম ছাড়া আর কিছু ছিল না।  মানুষজন মাছ আহরণ করে প্রধানত জীবিকা নির্বাহ করত।  দুবাইয়ে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয় ৫০ বছর আগে।  অনেকে ভাবি, তেল দুবাইকে আজকের দুবাই বানিয়েছে, তবে দুবাইয়ের ৯৫% অর্থনীতি তেলের বাইরে।  সত্যি কথা বলতে গেলে তাদের জিডিপি এর মাত্র ১-২ শতাংশ এই তেল থেকে আসে!

তেল থেকে দুবাইয়ের জিডিপি ১-২ শতাংশ হলেও, কেবলমাত্র টুরিস্ট এবং ভ্রমণ ব্যবসা তাদের জিডিপিতে ২০% ইনকাম আসে, যা আমরা অনেকে হয়ত কখনো ভাবিনি।  আর এই থেকে আমরা ধারনা করতে পাবি দুবাই এর অর্থনীতি কতটা গতিশীল এবং বৈচিত্রপূর্ণ।  তাহলে একটি জেলেদের গ্রাম থেকে কিভাবে দুবাই আজকের ধনী দুবাই হ্ল? কোন আইডিয়া কিভাবে একটি জনপদকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিক কেন্দ্র বানালো?

১৮২০ সালের পর থেকে দুবাই ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায় এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সমুদ্র থেকে মুক্তা আহরণ করাই ছিল তাদের প্রধান আয়ের উৎস।  তারা সেই মুক্তা ব্রিটিশ সরকারকে বিক্রির মাধ্যমে তাদের সার্বিক আয় করত।  দুবাইয়ের ঘুমন্ত মৎস্য ভিত্তিক অর্থনীতির জাগ্রত হওয়ার জন্য এই মুক্তা বাণিজ্য ছিল প্রথম সূচনা।  তবে পরে আস্তে আস্তে এই মুক্তা বাণিজ্য স্থবির হয়ে যায়, নিশ্চয়ই তাদের ভাগ্যে বড় কিছু লেখা ছিল।

১৯৫০ সালের শেষের দিক থেকে দুবাই এবং আবু-ধাবির সীমান্ত এলাকায় তেলের খনি নিয়ে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।  আর এই সময় দুবাই ছেড়ে অনেক মানুষ চলে জেতে শুরু করে।  বেশিরভাগ মানুষ আবু-ধাবি চলে যায়।  আবু ধাবি তেল বাণিজ্যে পুরোদমে লেগে পরে এবং সমৃদ্ধ হতে শুরু করে।  ১৯৫৮ সালের শুরু থেকে  দুবাইয়ের শাসক শেখ রশিদ বিন সায়েদ আল মাকতুম তেল বাণিজ্যে বেশি না ঝুঁকে দুবাইয়ের অবকাঠামোকে উন্নত করতে শুরু করেন।  প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার লোন নিয়ে তিনি ১৯৬০ সালে দুবাইয়ের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বানানো সম্পন্ন করেন।

অতঃপর দুবাই তেল এর বদলে পর্যটন ব্যবসায় বেশি মনোযোগ দেয়।  যদিও ১৯৬৬ সাল থেকে তারা তেল ব্যবসাতেও নামে।  ১৯৬৯ সাল থেকে তারা তেল রপ্তানি করা শুরু করে।  বাংলাদেশ যেমন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের থেকে স্বাধীন হয়েছিল, একইভাবে ১৯৭১ সালে দুবাই এবং তার আশেপাশের আমিরাতগুলো ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হয়।  অতঃপর দুবাই সহ আরও ৭ টি আমিরাত মিলে গঠন হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই। 

সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সদস্য হলেও দুবাই তাদের অর্থনীতির অপর পুরো স্বাধীনতা পায়।  আর ১৯৮০ সালের পর থেকে তারা তাদের আয়ের উৎস তথা রেভেনিউ প্রবাহকে বৈচিত্র্যপূর্ণ  আরও নানাদিকে সম্প্রসারিত করা শুরু করে।  আর এটি তাদেরকে সমৃদ্ধশালী আবু-ধাবির তেল সাম্রাজ্যের সাথে অর্থনৈতিক টেক্কা দিতে সহযোগিতা করে।

১৯৮৫ সালে দুবাই ‘জাজফা, জেবেল আলি ফ্রি জোন’ নামে তাদের প্রথম ৫২ বর্গ কিলোমিটারের একটি ফ্রি ইকোনমিক জোন তৈরি করে।  আর এই  ইকোনমিক জোন বা অঞ্চল ছিল পৃথিবীর যেকোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্যাক্স, আয়কর, কোন সীমাবদ্ধতা বিহীন একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল।  আর যা বিশ্ব ব্যবসা এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে বেশ ভালোভাবে আকর্ষণ করে। 

পরবর্তীতে এই ‘জাজফা, জেবেল আলি ফ্রি জোন’ এ ধীরে ধীরে হাজাররেও বেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা যুক্ত হয়।  এর অন্যতম একটি কারন পশ্চিমের বড় বড় দেশগুলো ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলোর সাথে এবং উত্তরের দেশগুলো পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে ব্যবসা করার জন্য মাঝখানে হাব এই দুবাই একটি গোল্ডেন প্লেস।

জাজফায় যুক্ত হওয়া কোম্পানি গুলোর মাধ্যমেই দুবাই’এ আস্তে আস্তে অনেক বড় বড় বিদেশি অর্থায়ন আসে এবং বড় বড় সব অবকাঠামোগুলো আস্তে আস্তে তৈরি শুরু হয়।  বর্তমানে দুবাইয়ে দেড় লাখ এর মতন বিদেশি জনশক্তি বিদ্যমান, যারা দুবাইকে ৯০ বিলিয়ন ডলার ইনকাম দিচ্ছে।  আর দুবাইয়ের মাথাপিছু আয় এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৫৭৭৪৪ হাজার মার্কিন ডলার।   দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশই বাংলাদেশি।

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন