কোনরকম ডিগ্রি ছাড়াই 'সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার' পদে চাকরি পেয়ে ক্যারিয়ার গড়ার গল্প

  কোন মন্তব্য নেই


সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আমাদের অনেকেরই স্বপ্ন। আমরা অনেকেই দিন্রাত এই স্বপ্ন দেখে বিভোর হয়ে থাকি যে, আমি হয়ত কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়বো। তবে আজকের পোস্টে আমি এমন একজনের গল্প তুলে ধরব, যিনি একজন সফল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, তবে তার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পিছনে একাডেমিক কোন ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নেই। অর্থাৎ তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেননি। তার নাম বোয়াজ ফ্র্যাঙ্কেল। আমি তার ভাষায় পুরো আর্টিকেলটি সাজিয়েছি, আশা করি আপনার পুরো গল্পটি পরে ভালো লাগবে।

আজ থেকে ৪ বছর আগে আইওএস (অ্যাপেল অপারেটিং সিস্টেম) ডেভেলপার হিসেবে আমি আমার প্রথম চাকরি পাই। আমার শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা, তথা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি এর উপর। আমার প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে কোন একাডেমিক ডিগ্রি ছিল না, আগে কোথাও কাজের এক্সপেরিয়েন্সও ছিল না। তবুও আমি আমার জীবনের প্রথম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং জব ম্যানেজ করি। আজ ২.৫ বছর হল আমি একটি সফল প্রযুক্তি স্টার্টআপ কোম্পানির সাথে যুক্ত আছি, আর হ্যা এখন আমি একটি বিষয় খুব প্রশান্তির সাথে বলতে পারি সবসময়, ‘আমি আমার পেশা এবং চাকরিকে খুব ভালোবাসি’।

প্রথম ধাপ- চেষ্টা এবং ব্যার্থতা 


আজ থেকে ৬ বছর আগে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি এর উপর মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার সময়, এবং বিগত কয়েক বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষকে নিয়ে আমার কাজ করার মধ্য দিয়ে, আমার মনে হয় সাইকোলজি থেকে আমার কিছুসময়ের জন্য ছুটি নেয়া উচিত। সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞান আমার কাছে অনেকটা একঘেয়েমি হয়ে গিয়েছিল। আমি মানুষের আচরন, সম্পদ তাদের বিনিয়োগের দিক ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে আমার মনের ভেতর বেশ কিছু আগ্রহ জুগিয়েছিলাম। The Road Not Taken কবিতাটি আমার জীবনে আমাকে বেশ প্রভাবিত করেছিল, এই কবিতাটি আমি আমার চিন্তা-ধারায় নিয়ে আমি বুঝেছিলাম আমাকে নতুন কিছু করতে হবে।

আমি তখন চিন্তা করি আমাকে এমন কিছু বেছে নিতে হবে যা আমাকে খুশি রাখবে, পাশাপাশি সাধারন ভাবে আমার জীবনযাপনও চালিয়ে দিবে। তখন আমি ব্যাবসা বিশ্লেষক তথা বিজনেস আন্যালিস্ট হিসেবে নিজের একটা পজিশন তৈরি করি। আমি অস্থায়ী ভাবে বিভিন্ন প্রোজেক্টে আকজ করি। তবে কিছু মাস কাজ করার পর বুঝতে পাই এই কাজ আমার জন্য নয়, তো আমি আবার নতুন কিছু করার কথা ভাবতে থাকি।

এমনকি আমি নিজের বিজনেস দার করার জন্যেও কাজ করি, একটি বিজনেস মডেল দার করানোর চেস্টা করি। তবে একসময় গিয়ে এখানেও আমাকে ব্যার্থ হতে হয়। তো এই মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার পর ২ বছরও আমার কি করব কি করব করতে করতেই চলে যায়। এমতাবস্থায় আমি ভাবি যে অনেকটা সময় আমি নষ্ট করে ফেলেছি, আর এই সময়টা ছিল আমার জীবনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে কয়েকটি বিষয় বের করতে সহায়তা করেছিলঃ


  1. আমি বুঝতে পারি আমাকে সৃজনশীল / উদ্যোক্তা ধাঁচের কোন কিছুতে কাজ করতে হবে।
  2. আমি বুঝতে পারি আমাকে এমন কিছু নিয়ে কাজ করতে হবে, যা মানুষের জীবনে প্রভাব রাখবে এবং মানুষ এখান থেকে উপকার পাবে। 
  3. আমি বুঝতে পারি যে আমি প্রযুক্তিকে ভালোবাসি, তবে আমি আজ পর্যন্ত যত কাজ করেছি, তাতে প্রযুক্তিকে ঠিকভাবে ব্যবহারই করতে পাইনি। 
  4. আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি দারুন কিছু তৈরি করব, যা মানুষের কোন কিছুর চিরাচলিত অভিজ্ঞতায় নতুন ভাবে উপকারে আসবে।
  5. আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় যে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি একটু দারুন কোম্পানি তৈরিতে কাজ করতে পারব, কেবল আমার কো-ওয়ার্কারদের জন্যই কোম্পানি দারুন হবে তা নয়, আমি এমনভাবে  করব যেন কোম্পানিটি কাস্টমারদের জন্যেও দারুন হয়। 


আর এই দিকগুলো আমার নিজেকে ভাবার আরেকটি সুযোগ করে দিলো, আমি এবার হয়ত সত্যি সত্যি বের করতে পারলাম আমি আসলে কি হব। আর এবার আমি ঠিক করলাম আমি আসলে নিজেকে একটি  প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলব। ‘যেই ভাবা সেই কাজ’ আমি খুব দ্রুত এই সেক্টরে কাজকরার জন্য আমার যা প্রয়োজনীয় দক্ষতা দরকার হয়,তা গ্রহন করা শুরু করে দিলাম যেন আমি আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারি।

তাই ঠিক করলাম, আমি কোন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে কাজ করব যেখানে কাজকরে আমি দারুন কিছু অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে আমি আবার নতুন কোন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হব। আমার মনে কিছু একটা পরিবর্তন আনার স্পৃহা তো রয়েছেই….তো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, এই সবকিছু করব কিভাবে?

দ্বিতীয় ধাপ- কোন পথে যাব   


তবে টেকনিক্যাল দিকে কাজ করার ক্ষেত্রে সেখানে অনেক দিক থাকে, আসলে সব নিয়ে তো কাজ করা যায়না । তাই আমাকে ভাবতে হয়েছে আমি যদি প্রযুক্তি স্টার্টআপ বা কোন প্রযুক্তি উদ্যোগের সাথে যদি কাজ করি তাহলে কোন বিষয় বা দিকে কাজ করব। তারপর আমি ঠিক করি আমি প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্টে কাজ করব।কেননা মনোবিজ্ঞানে পরার দরুন আমি একটা বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝতাম মানুষ আসলে কি চায়। আমি কম্পিউটার সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি গ্যাজেটসকে খুব বেশি ভালবাসতাম, আমি তাদের নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতাম , সবসময় আমার সাথে নানানরকম গ্যাজেটস রাখতে ভালোবাসতাম। প্রযুক্তির প্রতি আমার ব্যাপক দুর্বলতা ছিল। তবে মজার ব্যাপার, যে সেক্টরে কাজ করতে এতো চাচ্ছি, সেখানে কাজ করতে যে স্কিলটা দরকার মানে 'প্রোগ্রামিং' তা আমি একেবারে জানতামই না।

তো আমার এখন সামনে একটাই পথ খোলা , যা ছাড়া আমি এই সেক্টরে কিছুই করতে পারবনা। তা হলো প্রোগ্রামিং। তবে ব্যাপার হল আমি আসলে কি শিখবো। তখন আমি ভাবলাম আমি অ্যাপেলের প্রোডাক্ট ভালোবাসি, তাই এমনকিছু শিখি জাতে অ্যাপেলের  গ্যাজেট গুলো নিয়ে কাজ করতে পারি। আবারও 'যেই ভাবা সেই কাজ', আমি ঠিক করলাম আমি আইওএস ডেভেলপার হিসেবে নিজেকে তৈরি করব।

তৃতীয় ধাপ- কোডিং এর জগতে পা দেয়া


আমি প্রথমে চিন্তা করেছিলাম যে, আমি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে আইওএস ডেভেলপমেন্ট এর অপর কোর্স করব। তবে পরে ভাবলাম কোথাও আগে কোর্সে ভর্তি না হয়ে প্রথমত নিজে থেকে এক্সপ্লোর করা ভালো। তারপর আমি আইওএস বা অ্যাপেল অপারেটিং সিস্টেম এর অপর ইন্টারনেটে নিজে থেকে জানা শুরু করলাম। আমি এর বেসিক থিওরি গুলো নিজে থেকে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করলাম। আমি জানতাম এভাবে দেখার চাইতে আমি যদি করা শুরু করি তাহলে খুব ভালোভাবে শিখতে পারব।

তারপর আমি 'বাস্তব অ্যাপ তৈরি করার মাধ্যমে আইওএস শিখুন' নামক ইউডেমি থেকে একটি কোর্স কিনলাম। তো বুঝতেই পাচ্ছেন সেখানে শেখার সাথে সাথে আপনি একটি বাস্তব আপসও তৈরি করতে পাচ্ছেন, আর এর চাইতে ভালো শেখা কি হতে পারে? টেকনিক্যাল দিকে মূলত প্র্যাক্টিক্যালই সব। ইউডেমি এর কোর্স ছাড়াও আমি লিন্ডা থেকে  প্রোগ্রামিং এর বেসিকএর অপর টুকটাক বিভিন্ন কোর্স করেছি। টানা ৩ মাস প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা এই কোডিং শেখার পিছনে পড়াশোনা করে, আমি মোটামটি কোডিং কে নিজের আয়তন এর ভেতর আনতে পারি।

আমার শেখার ধরন ছিল যে, আমি কোন টপিকটি জানতে চাই তা বের করা, তারপর সেটির অপর সবচাইতে ভালো লার্নিং রিসোর্স খুঁজে সেই স্পেসিফিক টপিকটি শিখে নেয়া। আমি আমার প্রোগ্রামিংশেখার সময় সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলিনি, আমি ভাগ করে নিয়েছিলাম যে আমি আসলে কোন টপিক শিখতে চাই এবং শুধু সেটির ওপর ফোকাস করেছি। আর এভাবেই আমার প্রোগ্রামিং তথা কোডিং শেখাটা সফল হয়েছে।

চতুর্থ ধাপ - আমার প্রথম আইওএস ডেভেলপার হিসেবে চাকরি পাওয়া 


আমি ভেবেছিলাম আমি আরও কিছু মাস শেখার পিছনে ব্যয় করব, তারপর আমার স্বপ্নের চাকরির জন্য খোঁজ করব। তবে আমি বেশি কাল ক্ষেপণ করলাম না, ভাবলাম কখন কি হয় বলা যায় না। তো আমি চাকরি খোঁজা শুরু করলাম, বেতন যাই হোক আমার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, আমার শুধু দরকার ছিল অভিজ্ঞতা, যা আমি চাকরি করে অর্জন করতে পারব।

খোঁজাখুঁজির কিছুদিন পর আমি একটি সফটওয়্যার এজেন্সির মালিকের থেকে চাকরির  ইন্টারভিউ এর ডাক পাই। এজেন্সির মালিক আমাকে বলেন একডেমিক ডিগ্রি বা এরকম কিছুর পরোয়া তিনি করেন না, তবে তিনি একটি টেস্ট নিবেন যেখানে আমাকে পাশ করতে হবে, আর তবেই আমি 'জুনিওর আইওএস ডেভেলপার' পদে আমার চাকরি পেয়ে যাব। তো আমি আগেই টেস্ট এর জন্য হ্যা না বলে, আমি তার থেকে তার অফিসে কিছুদিন ঘোরার অনুমতি প্রার্থনা করি।

আমি জানতাম কিছুদিন যদি আমি এরকম একটা অফিসে ঘুরে অন্য সব কর্মচারীদের সাথে কথা বলে, তাদের অফিস ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করি তবে তা আমার শেখার জন্য আরও কাজে দিবে। আর এটি আমাকে একভাবে টেস্ট পরীক্ষা দেয়ার জন্যেও মনবল জোগাবে। তো আমি কিছুদিন তাদের অফিসে যাতায়াত করি। আর এক পর্যায়ে আমি টেস্ট দেয়ার জন্য প্রস্তুত হই।

সেই চাকরির টেস্ট পরীক্ষায় অবজেক্ট অরিয়েন্টেড ডিজাইন সম্পর্কিত কিছু থিওরিটিক্যাল প্রশ্ন আসে, আইওএস সম্পর্কিত কিছু স্পেসিফিক প্রশ্ন আসে, কিছু গানিতিক এবং অল্গরিদম ভিত্তিক প্রশ্ন আসে। আরেকটি বাসায় করার জন্য টাস্ক দেয়া হয়, যা আমি সফলভাবে সম্পন্ন করি। আর পরীক্ষায় সফলভাবে পাশ করার পর আমি আমার স্বপ্নের চাকরি পেয়ে যাই। প্রতিষ্ঠান কত ছোটো বা বড় তা আমার কাছে মুখ্য ছিল না। আমার কাছে জরুরি ছিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজেকে দেখা, যার প্রথম পর্যায়ে এসেছিলাম এই 'জুনিওর আইওএস ডেভেলপার' পদে চাকরি পেয়ে।

৫ম ধাপ- আজ


সেখানে আমার টিমে আমি সহ ছিলাম আরো ২ জন, আমাদের কাজ ছিল প্রচুর। আমি এই সফটওয়্যার এজেন্সিতে কাজ করাকে আমার চোখে ইন্টার্নশিপ হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। আমি সেখানে কয়েকমাস কাজ করার পর আবার নতুন চাকরির উদ্দেশে খোঁজ শুরু করে দেই। এবার আমি সিলিকন ভ্যালির একটি নতুন স্টার্টআপ কোম্পানিতে ইন্টারভিউ এর জন্য ডাক পাই। তবে তারা কেবল একজন ডেভেলপারকে চায় যে একা তাদের অ্যাপস এর কাজ করবে। আমি তখন ভাবি, আমি এতোটাও ভালো প্রোগ্রামার নই যে একা পুরো একটি অ্যাপলিকেশন এর কাজ ধরে আবার শেষ করতে পারব। তবে পরক্ষনে আমি ভাবি এটি আমার জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে, কেননাএখানে আমার প্রতিষ্ঠানটির ফাউন্ডারদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক থাকছে, আর তারা আমাকে কতোটা... বিশ্বাস করবে যদি আমি কাজটি করতে পাই।

অতঃপর আমি আমার ভাগ্যক্রমে সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ পাই। আর আমি আমার জানার থেকেও অনেক বেশি কিছু শিখে তাদের সেই আইওএস অ্যাপলিকেশনটি তৈরি করে দেই। যেই প্রতিষ্ঠানে আমি ছিলাম ২য় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সেই প্রতিষ্ঠান আজকের দিনে শত এর বেশি নতুন ইঞ্জিনিয়ার যুক্ত হয়েছে, আর আয়ের দিক দিয়েও প্রতিষ্ঠানটি বহুগুনে উন্নত হয়েছে। আমি এখনও বর্তমানে এই প্রযুক্তি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের সাথেই কাজ করছি, আর খুব প্রশান্তির সাথে বলতে পারি; আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আর আমি আমার পেশাকে ভালোবাসি। 

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন