স্মার্টফোন এবং আজকের শিশু

  কোন মন্তব্য নেই
আমার ২ বছর বয়সের মামতো ভাই খুব কান্নাকাটি করছিল, সে ভাত খাবে না। এমন সময় তার হাতে একটি এন্ড্রয়েড স্মার্টফোনে একটি গেমস ওপেন করে দেয়া হল, অতঃপর সে দিব্যি খুশি হয়ে গেম খেলার সাথে সাথে তার খাওয়াটাও সেরে নিলো। এখন স্মার্টফোনে গেম খেলা আর খাওয়া তার একটি অভ্যাস। ভাবার বিষয় হচ্ছে যে আজকের সময়ে এরকম ঘটনা গুটিকয়েক নয়, সব জায়গাতেই চোখে পরবে।




লক্ষ্য করার মত বিষয় হল,আজকের দিনে সকল মানুষের কারনে-অকারণে স্মার্টফোন স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে ওই আবছা আলোয় বুদ হয়ে থাকা যেন মহামারীতে রূপ নিয়েছে। আমরা একা নয়, বর্তমানে প্রায় ১.৮ বিলিয়নের বেশি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আর অনেক গবেষণা ফলাফল থেকে পাওয়া গিয়েছে একজন স্বাভাবিক মানুষ দিনে প্রায় ১৫০ বার তার স্মার্টফোন স্ক্রিনের দিকে কোননাকোনো কারনে তাকায়।

আরও পড়ুনঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নাকি সমাজ থেকে বের হওয়ার পথ! 

আর বিশ্বব্যাপী এই প্রযুক্তি ডিভাইসটির বিস্তৃত ব্যবহারের প্রভাব এখন পরিবারের সবচেয়ে ছোটো সদস্যদের ওপরও পড়ছে, আর তারা হচ্ছে শিশু। ব্রিটেইন এর একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, প্রায় ৬০% শিশু যাদের বয়স ১১-১২ বছরের ভেতর তারা নানা কারনে প্রত্যক্ষভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আর ৯০% স্মার্টফোন ব্যবহার করে যাদের বয়স ১৪ বা তার উপরে। আন্তর্জাতিক পত্রিকা  ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর কিছুদিন আগের একটি সংবাদে দেখা যায় যে, আমেরিকার ৫৯% শিশু যাদের বয়স ১১ বছর তাদের নিজস্ব স্মার্টফোন রয়েছে। আর ৬৯% শিশুর নিজস্ব স্মার্টফোন আছে, যাদের বয়স ১২। 

এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজকের শিশুদের ইচ্ছের তালিকায় ক্রিকেট, ফুটবল, পুতুল এবং খেলার মাঠের স্থান দখল করেছে এই স্মার্টফোন। ২-৫ বছরের শিশুরা বাবা-মার স্মার্টফোনে গেমস খেলা,ভিডিও দেখার জন্য যে জেদ করে তা খুবই ভাবিয়ে তোলে; আর একারনে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরই আমাদের দেশে শিশুদের স্মার্টফোন প্রাপ্তির চাহিদা শুরু হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে নিম্ন মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিশুকিশোরদের হাতেও নিজস্ব স্মার্টফোন দেখতে পাওয়া যায়।

শিশুকিশোররা ছোটবেলা থেকেই এই স্মার্টফোনের নেশায় পরে। এক পর্যায়ে তাদের নিজেদের স্মার্টফোন কেনার আকাংখ্যা জাগ্রত হয়। আমাদের দেশে দেখা যায় কি, তারা বাবা মার কাছে প্রাইভেট এর টাকা,বই এবং নানারকম ফি এর কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়। অতঃপর এসব টাকা নিয়ে তারা পুরাতন, এমনকি অনেকসময় অবৈধ চোরাই স্মার্টফোন কিনে থাকে। এসব স্মার্টফোন তারা তাদের ব্যাগে অথবা কোনো বন্ধুর বাসায় সংরক্ষন করে। এভাবে অনেক শিশুদের স্মার্টফোনের প্রতি নেশা এবং এটিকে প্রাপ্তির লোভ তাদের ভেতর ছোটোবেলাতেই একটি নেতিবাচক গুণাবলী সঞ্চার করছে।

একটি শিশুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক বয়সে মানসিক বিকাশের জন্য মুখোমুখি/সামনাসামনি যোগাযোগ বা কথোপকথন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর যাকে বলা হয় ফেস-টু-ফেস ইন্টারঅ্যাকশন। বর্তমানে সময়ে যখন একজন শিশুর তার বাবা মার সাথে যোগাযোগের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, এই দূরত্বের ভেতর তখন শিশুর সময় কাটানোর জন্য ঢুকে পরে স্মার্টফোন। আর এখান থেকে  সারাজীবনের জন্য তৈরি হয় স্মার্টফোন আসক্তি। শহরে যেসব বাবা-মা সন্তানকে বাসায় রেখে চাকরিতে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, তাদের শিশুদের ভেতর এই ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করা যায়। 

একজন শিশু তার জন্মের পর ২-৫ বছর বয়সে বড়দের (বিশেষ করে বাবা-মা) দেখে কথা বলা শেখে,  তারা তাদের নিজের আবেগ সম্পর্কে শেখে, তারা আরও শেখে কিভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রন করতে হয়। আর যদি শিশু বয়সেই এই চিরাচলিত প্রক্রিয়া থেকে তারা ব্যাহত হয়, তবে তারা তাদের মানসিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে গেল। যার প্রতিক্রিয়া বড় হলেও তাদের আচরনে পরিলক্ষিত হবে। আর শিশুর উঠতি বয়সে এই চিরাচলিত বিকাশ ধারায় বাধা সৃষ্টি করার জন্য অন্যতম দায়ি এই আজকের স্মার্টফোন।

স্মার্টফোন অনেক নতুন প্রযুক্তি। বিশ্বব্যাপী এই স্মার্টফোনের প্রসার বড়জোর ১২-১৩ বছর হল। আর আমাদের দেশে এর প্রসার ৭-৮ বছর হল। যেহেতু নতুন প্রযুক্তি তাই আগে স্মার্টফোনের প্রভাবে কোন কোন শিশুর ক্ষতি হয়েছে তা খুঁজতে গেলে হয়ত ভুল হবে। হতে পারে, এই স্মার্টফোনের ক্ষতিটা পরিলক্ষিত হতে শুরু করল আমাদের প্রজন্মের শিশুদের ভবিষ্যত সময়ে! সুতরাং, আমাদের বাবা-মা দের অবশ্যই শিশুদের নাগালের ভেতর স্মার্টফোন রাখা না রাখা নিয়ে ভাবা উচিত। যেন এবয়সেই তারা স্মার্টফোন আসক্তিতে না পরে। আর আমাদের উচিত আমাদের ছোটো ভাই বোনের হাতে স্মার্টফোনে গেম তুলে না দিয়ে, তাদের সাথে নানা রকম খেলায় মেতে ওঠা। লুকোচুরি, গোল্লাছুট, বউচি, ফুটবল, ক্রিকেট আর এই শীতে ব্যাডমিন্টন সহ আরো কতোকি…!

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন