সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নাকি সমাজ থেকে বের হওয়ার পথ!

  কোন মন্তব্য নেই

সকালে আপনার বাসায় বা আশেপাশে প্রতিদিন যে লোকটি পত্রিকা দিয়ে যায়, তার সাথে আপনার পরিচয় কেমন? এলাকায় রাস্তার মোড়ে যে লোকটি ফুচকা বিক্রি করে তার সাথে কি আপনার কথোপকথন হয়? আজকের সমাজে অনেকেরই হয়ত এসবের উত্তর হবে ‘না’। আমরা সবাই স্মার্টফোনের সাথে দারুনভাবে যুক্ত। বর্তমান সময়ের তথ্য প্রযুক্তির অন্যতম ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় একটি অংশ হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। আর আধুনিক ইন্টারনেট এর সহজলভ্যতার খাতিরে সবারই ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম সহ আরো নানাবিধ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর এসবের পিছে ঝোঁকার জন্য আমাদের কাছে দারুন একটি কারন থাকে যা হল; সামাজিক হওয়া, সমাজের সাথে যুক্ত হওয়া। তবে আদৌ সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের ভিতর কতটুকু  মূল্যবোধের উন্নতি করে সামাজিক আদর্শ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, নাকি সামাজিক মূল্যবোধ এর বিকৃতি ঘটিয়েছে তা ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ স্মার্টফোন এবং আজকের শিশু


আপনি বাসার ওয়াটারপাম্পকে একটি পানি তোলার মেশিনই বলবেন, আবার রান্নাঘরের রেফ্রিজারেটরকে খাবার ঠাণ্ডা করার যন্ত্রই বলবেন। তবে মোবাইল তথা স্মার্টফোনকে কেবল একটি যন্ত্র বা ডিভাইস বললে ভুল হবে! কেননা বর্তমান পৃথিবীতে স্মার্টফোন  আমাদের  জীবনের অবিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত হয়েছে। কোথাও কারো জন্য অপেক্ষা করার সময়, বাসায় নিজের পরিবারের সাথে বসে থাকার সময়, এমনকি কাজে ফাঁকি দেয়ার সময়েও; আমরা কখন স্মার্টফোনটা খুলে এই ভার্চুয়াল সমাজের ভেতর থাকিনা? বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন এবং কম্পিউটিং ডিভাইসের কল্যাণে একটি অন্ধকারাবৃত সমাজের সূচনা শুরু হয়েছে।


সামাজিক মাধ্যমগুলো মানুষের ভেতর একটি অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুন এমনকি শিশু-কিশোরদের ভেতর একটি নেতিবাচক অভ্যাস তৈরি হয়েছে, যা হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর ফোন চেক করার প্রবনতা। আশেপাশে কথা বলার মত, সময় কাটানোর মত অনেক মানুষ থাকলেও এই ফোন চেক করার প্রবনতা তখনও বিদ্যমান থাকে, যার কারনে একে বলা হচ্ছে নেতিবাচক অভ্যাস। একটা বিষয় মানতে হবে যে, কোন একটি সামাজিক মাধ্যমে আপনার হাজার বন্ধু থাকলেও তা আপনার বাস্তব জীবনের একজন বন্ধুর সমান হবে না। তবে আমরা অনেকে এখন ভার্চুয়াল সম্পকর্কে বাস্তবের সাথে তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছি, যেখানে সামান্য রিয়েক্ট বাটনে চাপার হেরফের হলেও মানুষের ভেতর অনেক ভুলবোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। 


বর্তমান তরুন সমাজ তথ্য প্রযুক্তির দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই কথা আমরা বলতে পারি। তবে এখনও দেশের বহু তরুন সমাজের এই তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এর সীমা কেবল এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্তই। ব্যাপারটা এরকম নয় যে, তারা সামাজিক মাধ্যম অলগরিদম কিভাবে কাজ করে এবং একে ব্যবহার করে কিভাবে নানাক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাপনকে সহজ করা যায় তা নিয়ে ভাবছেনা। বরং তাদের বেশিরভাগই সামাজিক মাধ্যম নিয়ে ভাবে যে, তারা এতে আদৌ কতোটা পরিচিত, সে সামাজিক মাধ্যমে অবহেলা(ইগনর) এর স্বীকার হচ্ছে কিনা, সামাজিক মাধ্যমে তাকে কতজন চেনে এসব।


এই মাধ্যমটি পরিণত হয়েছে একটি মঞ্চে; যে মঞ্চে কে কতোটা বেশি অনন্য এবং আধুনিক তা তুলে ধরতে ব্যাস্ত। যেকোনো মানুষ মনের অজান্তেই এখানে নিজেদেরকে অন্যদের সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। স্কুলে পড়ুয়া একজন ছেলে যখন সামাজিক মাধ্যমে তার বন্ধুর জাকজমকপূর্ণ ছবি দেখে নিজেকে তার মত হওয়ার কল্পনা করবে, তখন তার এই ইচ্ছা পূরণের দাবি চাপবে ছেলেটির বাবা-মার উপর। আর বর্তমান সময়ের এক শ্রেণির কিশোর কিশোরীদের আভিজাত্য যাপন, পশ্চিমা সভ্যতার সাথে নিজেদের তুলনা করে তাদের মত করে চলা, তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের প্রদর্শন করা, যা কে বলা হয় শো-অফ, তা যেন একরকম করে বর্তমান সামাজিক মাধ্যমের নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন