জায়েদ ইবনে হারিস : মোহাম্মদ (স) এর পালিত পুত্র

  কোন মন্তব্য নেই


জায়েদ ইবনে হারিস (রা) ছিলেন মোহাম্মদ (স) এর পালিত পুত্র।  নবি (স) নবুয়ত পাওয়ার পর তিনি সেইসব প্রথম সারির সাহাবায়ে কেরামদের একজন যারা সরাসরি রাসুল মোহাম্মদ (স) এর নবুয়ত এবং ইসলামে ঈমান এনেছিলেন। 

সে সময় খাদিজা (রা) এর ঘরে তার স্বামী নবি মুহাম্মদ (স)  ছাড়া জায়েদ ইবনে হারিস এবং মুহাম্মদের চাচা আবুতালেবের পুত্র আলী বাস করতেন। আলীকে মুহাম্মদ তার চাচা আবু তালিবের দরিদ্র-পীড়িত সংসার থেকে চাচার স্নেহ-মমতার প্রতিদান হিসাবে নিজের কাছে প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেন। একদিন খাদিজা (রা) জায়েদকে মুহাম্মদ (স) এর নিকট নিয়ে এসে বলেন : এই ছেলেটি আমার ক্রীতদাস। এই ছেলেটিকে আমার ভাতিজা হাকিম ইবনে হিশাম উপহার দিয়েছে। আমি তাকে তােমার একান্ত সেবার জন্য দান করলাম। মুহাম্মদ (স) ছেলেটির নাম জিজ্ঞেস করলে সে নিজে জায়েদ ইবনে হারিস বলে জানায়। সে বনী কলব গোত্রের বলে দাবি করে। উল্লেখ্য, কলব গোত্র আরবের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ গোত্রের মধ্যে অন্যতম। কি করে মক্কায় এলাম এ কথা জানতে চাইলে - ছেলেটি মুহাম্মদ (স) কে বলে : সে তার মায়ের সাথে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে দস্যুরা আমাদের কাফেলা আক্রমণ এবং সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। ছেলেটিকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মক্কার বাজারে বিক্রি করে দেয়। সে সময় বাজার থেকে হাকিম ইবনে হিশাম তাকে কিনে নেয়। কিভাবে তার মক্কায় আসে। সে সময় তার বয়স পনেরো-ষোলো বছরের মতো। এ বয়স থেকে জায়েদ তার নতুন

মালিক মুহাম্মদ (স) এর এক বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে নিয়োজিত হয়।  বিশেষ করে যখন থেকে মুহাম্মদ (স) মক্কাবাসীদের সকল রকম অধর্ম আচরণ তথা মূর্তিপূজা, খুনাখুনি, লুটতরাজ কুসংস্কার থেকে মুক্ত করবার চিন্তায় হেরার গুহায় নির্জনে সত্যের সন্ধানে ধ্যান-ধারণায় নিজকে নিয়ােজিত করেন-তখন থেকেই জায়েদ ইবনে হারিস পর্বত গুহায় মুহাম্মদ (স) এর সার্বিক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে। মুহাম্মদ মাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। অন্যদিকে ছেলে হারানো জায়েদের পরিবার তাকে হারিয়ে শোকে ম্রিয়মান। তার সকল আত্মীয়-স্বজন পাগলপারা হয়ে তাদের হারানো পুত্রের খোঁজে মক্কায় আসে। তাদের দৃঢ় ধারণা ছিলাে ছেলেটিকে ডাকাতগণ নিশ্চয়ই মক্কার বাজারে কারো কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। যদি ভাগ্যগুণে ছেলেটিকে কোথাও পাওয়া যায় তবে উপযুক্ত মুক্তিপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করে বাড়ি নিয়ে যাবেন। এ উদ্দেশ্যে ছেলেটির বাবা ও চাচা মক্কায় আসেন। তারা এখানে অপরিচিত। কাউকে তারা চেনেনা। তাদেরকেও কেউ চেনেনা। অপরিচিত দেশ। তাই জায়েদের বাবা ও চাচা কাবার পাশে বসে ভাবতে থাকে। নানা দুশ্চিন্তায় তাদের ঘুম আসছিল না। দুই ভাই আলাপ করেছেন যে আমাদের মনে হয় জায়েদ মক্কায় কোথাও না কোথাও আছে। এভাবে তারা পরস্পর আলাপ-আলোচনা করছিলেন। এ সময় মক্কার এক লোক রাতের আড়া-থেকে ঘরে ফেরার কালে আড়াল থেকে জায়েদের বাবা ও চাচার কথা শুনলাম। এগিয়ে গিয়ে বললাে আমার মনে হয় তােমরা বাইরে থেকে এসেছে।

তারা বললেন : “আমরা মক্কার লােক নই। আমরা শােকে-দুঃখে কাতর হয়ে আমাদের হারানো ছেলে জায়েদকে খুঁজতে এসেছি। আমরা আরবের বনী কলব গোত্রের লোক। তাদের ভাগ্য ভালো, মক্কার ঐ লােকটি জায়েদের বিষয়ে জানতে। সে তাদেরকে বলল তোমাদের ছেলে মক্কার সেরা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদের (নবি করিম স.) নিকট আছে। তাই তাকে দিতে তোমাদের কষ্ট হবে না। মুহাম্মদ (নবি করিম স.) প্রতি সকাল বেলা এই কাবাঘরে আসেন। কিন্তু মূর্তিপূজা করেন না। নিজের মতাে ধ্যান অর্চনা করেন। যারা মূর্তিপূজারী তাদের সঙ্গে তিনি মিশেনও না। এ সংবাদ শুনে জায়েদের বাবা ও চাচার মনে স্বস্তি ফিরে আসে। রাত পোহাবার প্রহর গুনতে থাকে। আশা-নিরাশায় এভাবে রাত কেটে যায়। সকালে মুহাম্মদ (স) ঠিকই মক্কাবাসীর তথ্য অনুযায়ী চিহ্নিত স্থানে উপাসনা করতে আসেন। এ সময় তারা মুহাম্মদ (স) এর নিকট এসে তাদের হারানো ছেলের কথা বলে। আমাদের সন্তান জায়েদ সে দাস নয় - সে সম্রান্ত ঘরের ছেলে। হে আল আমীন আমরা জানতে পেরেছি সে আপনার নিকট আছে। মুক্তিপণ দিয়ে আমরা তাকে মুক্ত করতে এসেছি। আপনি তাকে মুক্ত করে দিন। সে আমাদের সন্তান। তার অভাবে তার মা এবং আমরা সবাই দিশেহারা । দস্যুরা তার মার কাছ থেকে ছিনিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেয়। আমরা যে কোনো মূল্যে তাকে মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। আপনি আমাদের প্রতি সদয় হোন। বিস্তারিত শুনে মুহাম্মদ (স) বলেন, "আপনাদের সন্তান জায়েদ আমার নিকটই আছে এবং সে এখন সম্পূর্ণ মুক্ত। কোনাে মুক্তিপণ দিতে হবেনা। তবে আমার শর্ত একটাই। সে যদি ইচ্ছা করে আপনাদের সঙ্গেযেতে না চায় তবে আপনারা তাকে জোর জবরদস্তি করে নিয়ে যেতে পারবেন না।" জায়েদের বাবা-চাচা মুহম্মদের এ প্রস্তাবে সম্মতি জানান। ছেলে মুক্তি পেয়ে নিজের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাবে এতাে স্বাভাবিক। এ নিয়ে ভাবনার কি আছে? মুহাম্মদ (স) জায়েদকে বললাে :তোমার বাবা-চাচা আমাকে নিতে এসেছে, তুমি মুক্ত। তুমি ইচ্ছা করলে তাদের সঙ্গে ঘরে ফিরে যেতে পারে। তোমাকে আটকাবে না।

কিন্তু জায়েদ-বাবা-চাচার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলে। সন্তানের উত্তর শুনে তারা ঝরঝর করে কেঁদে বুক ভাসালেন। জায়েদ তার সংকল্পে অটল। মুহাম্মদ যখন দেখলেন জায়েদ তার পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজনকে ত্যাগ করে মুহাম্মদকেই বেছে নিয়েছেন তখন মুহাম্মদ বিস্মিত আশ্চর্য হয়ে জায়েদের হাত ধরে কাবায় দাঁড়িয়ে। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন : তোমরা সাক্ষী থেকো। আজ থেকে জায়েদ মুক্ত এবং সে আমার ছেলে। সে আমার উত্তরাধিকারী হবে। আমি তার জিম্মাদার। এভাবেই জায়েদ নিখিলের চির সুন্দর বিশ্বের বিস্ময় শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ নবি মুহাম্মদ (স) এর নিত্যদিনের সঙ্গী হবার সৌভাগ্য অর্জন করে। মুহাম্মদ (স)  জায়েদ (রা)কে নিজের পুত্রবৎ আদর করতে ত্রুটি করেন না। এমনকি পরিণত বয়সে মুহাম্মদ আপন ফুফাতো বোন জয়নবকে তার সাথে বিবাহ দিয়ে জায়েদকে সম্মানিত করেন।

ধন্য জায়েদ, ধন্য তার পিতা-মাতা, ধন্য তার বংশ গৌরব।

জায়েদের মতাে উৎসর্গকৃত প্রাণ পেয়ে ধন্য ইসলাম। সেই প্রথম পুরুষ যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল'-এই কালেমা বিশ্বাস স্থাপন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। উল্লেখ্য, আল-কোরআনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লামের নামের পর নবীর অনুসারী সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একমাত্র জায়েদের নামই সন্নিবেশিত আছে। ইসলামের ইতিহাসে জায়েদের মতাে আল্লাহ ও রসূলের প্রিয় অন্য কেউ ছিলোনা। উল্লেখ্য, যায়েদ ও জয়নবের এই বিবাহ দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীকালে মুহাম্মদের আজীবন পালিত ও ছাত্রী উম্মে আয়মান তথা বিধবা বারাকাহ বিবাহ করেন। তখন জায়েদের বয়স ত্রিশ। আর বারাকার বয়স ষাট। তাদের এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তার নাম ওসামা। অনেকের মতে ওসামার বংশ এখান থেকেই সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে মুখা রণাঙ্গনে মক্কা বাহিনীর দক্ষ সেনাপতি হিসেবে সৈন্য পরিচালনা ও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে জায়েদ শাহাদাৎ বরণ করেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শেষ জীবনে রােগ শয্যা থাকা অবস্থায় জায়েদের তরুণ পুত্র ওসামাকে এক যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি নির্বাচন করে পাঠান এবং এই যুদ্ধে তার নেতৃত্বে মক্কা বাহিনী জয়ী হয়।

বুলবুলে মদিনা,সাবির আহমেদ চৌধুরী (পৃষ্ঠাঃ ৫৮) অবলম্বনে

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন