পিপিই পরে বাসায় ডাকাতি: করোনার দিনগুলিতে নতুন আতঙ্ক!

  কোন মন্তব্য নেই
ঘটনাস্থল টাঙ্গাইল। রাত আনুমানিক একটা। স্বাভাবিক সময় হলেও এত রাতে রাস্তাঘাটে মানুষজন থাকে না, তার ওপরে করোনাভাইরাসের কারণে এখন চলছে লকডাউন, সন্ধ্যা ছয়টার পরেই রাস্তায় তেমন কাউকে চোখে পড়ে না। হুটহাট শব্দ করে ছুটে যায় পুলিশ ভ্যান অথবা অ্যাম্বুলেন্স।



শহরের একটা আবাসিক ভবনের নিচে এসে চারজন ব্যক্তি সিকিউরিটি গার্ডকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। এদের মধ্যে দুজন মাস্ক, গ্লাভস পরা এবং দুজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক পরা। ভেতর থজেকে গার্ড তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বললেন, হাসপাতাল থেকে এসেছেন। কারণ তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে, এ বিল্ডিংয়ে করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছে। তাকে নিয়ে যেতেই এসেছেন তারা।

বিল্ডিংয়ের সবাইকেই গার্ড চেনেন, গত কয়েকদিনে কারো জ্বর-শ্বাসকষ্ট হয়েছে বলে তারত জানা নেই। এজন্যেই সন্দেহ হলো পুরো ব্যাপারটায়। তাছাড়া এত রাতে তো হাসপাতাল থেকে লোক আসার কথা নয়, এলেও যে ফ্যামেলিতে আক্রান্ত রোগী আছে, তারা নিশ্চয়ই সিকিউরিটি গার্ডকে জানাতো ব্যাপারটা। গার্ড কোনোভাবেই দরজা খুলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। কিন্তু তারা ভয় দেখিয়ে দ্রুত গেট খোলার জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিল।

গার্ড তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন স্বয়ং বাড়িওয়ালা ওপর থেকে এসে গেট খোলার জন্য তাকে বললেও তিনি কিছুতেই গেট খুলে দেবেন না। তাদের যদি সত্যি সত্যিই করোনা রোগী নিয়ে যেতে হয় তবে সকাল পর্যন্ত বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ তর্কের পরেও গার্ড গেট খুলে না দেওয়ায় তারা তাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগাল করে চলে গেল এবং শাসিয়ে গেল যে, সকালে এসে তাকে দেখে নেবে।

কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, সকালে কেউ সেই বাড়িতে করোনা রোগী নিতে আসেনি। কারণ পুরো ভবনে প্রকৃতপক্ষে কোনো করোনা রোগী নেই। সকালে ঘটনা শুনে এবং থানায় যোগাযোগ করে সবাই বুঝতে পারলেন, রাতে আসা এই লোকগুলো আসলে ছদ্মবেশী ডাকাত ছিল। গার্ড বুদ্ধি খাটিয়ে সেই মুহূর্তে ব্যাপারটা সামাল না দিলে খুব খারাপ কিছুই ঘটতে পারতো।

শুধু টাঙ্গাইল নয়, এমন ঘটনা এখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে, রাতের বেলায় ‘হাসপাতাল থেকে, থানা থেকে আসছি’ বলে বাসায় ঢোকার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারো পরনে পুলিশের পোষাক, কয়েকজনের গায়ে আবার পিপিইর মতো দেখতে আবরণ। ঢাকার গুলশান ও ধানমন্ডি এলাকায়ও মধ্যরাতে বাসাবাড়ির সামনে ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই), মাস্ক ও গ্লাভস পরা লোকজনকে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। কণ্ঠশিল্পী এলিটা করিম আজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ধানমন্ডির ৫ এবং ৯ নম্বর রোড, গুলশান ১ ও ২ নম্বরে ঘটা এরকমই কয়েকটা ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।

টাঙ্গাইলের মতো ঘটনা এসব এলাকায়ও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডাক্তারদের পিপিই এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোষাক পরে এসে মাঝরাতে গেট খুলতে বলা হচ্ছে, তাদের দাবী তারা করোনায় আক্রান্ত রোগীকে নিয়ে যেতে এসেছে। কয়েক জায়গায় এভাবে মাস্ক এবং পিপিই পরে ডাকাতির খবরও পাওয়া গেছে। ওষুধের দোকানেও ঘটেছে ডাকাতি। তারাও মাস্ক পরে ঢুকেছিল ডাকাতি করতে। পুলিশ এমন একটি চক্রকে গ্রেফতারও করেছে। করোনার এই অস্থির সময়েই নতুন একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

পুলিশের কাছেও ইতিমধ্যেই খবর পৌঁছেছে, এরকম কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বাসার মূল ফটকের গেট না খুলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় বিষয়টি জানানোর পরামর্শ দিয়েছে ঢাকা জেলা পুলিশ। এক বিজ্ঞপ্তিতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে- ‘কোন ব্যক্তি যদি পিপিই পরিহিত অবস্থায় ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী বা পুলিশ পরিচয়ে কোন বাসাবাড়িতে করোনা রোগী খোঁজ খবর করার সংক্রান্তে দরজা খুলতে বলে কেউ দরজা খুলবেন না। যদি কেউ ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী বা পুলিশ পরিচয়ে করোনা রোগী নিয়ে যেতে চেষ্টা করে তাহলে দরজা না খুলে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বা ডিউটি অফিসারকে জানান।’

খারাপ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে আমরা বরাবরই পারদর্শী। করোনা রোগী সনাক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক-স্যানিটাইজারের দাম আকাশে উঠে যায়, লকডাউনের খবর আসামাত্রই বাজার করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করি আমরা-—দেশে করোনার এই সময়ে ডাকাতেরাও যে পিপিই আর পুলিশের পোষাক পরে ছদ্মবেশ নিয়ে ডাকাতি করতে আসবে- এতে আর অবাক হবার কি আছে!

সাবধান থাকুন, ভাইরাস থেকে, মানুষের কাছ থেকেও। অপরিচিত কেউ দরজা খুলতে বললেই খুলে দেবেন না, সে থানা থেকে আসুক, হাসপাতাল থেকে আসুক আর জাহান্নাম থেকেই আসুক না কেন। বাসার দারোয়ান বা গার্ডকে বলে দিন, দিনরাত সারাক্ষণই যাতে গেট বন্ধ রাখে, পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে যাতে কাউকে ভেতরে ঢুকতে না দেয়। সাবধানতা যেমন আপনাকে ভাইরাস থেকে বাঁচাতে পারে, তেমনই পারে ডাকাতদের হাত থেকেও রক্ষা করতে…

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন