আরিফ আজাদ সমীপে: মিথ্যাচার ও ঘৃণার চাষাবাদ

 

আরিফ আজাদ, নিজের কাছে সৎ হয়ে, নিজেকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, আপনি যা লিখছেন তা কি পুরোপুরি জেনে-বুঝে লিখছেন? আপনার অসংখ্য অনুসারী বাংলাদেশে, যারা আপনার কথা অন্ধভাবে গ্রহণ করে। তাদের কাছে সঠিক তথ্যটি পৌঁছানো কি আপনার নৈতিক দায়িত্ব নয়?

সম্প্রতি আরিফ আজাদ সাহেবের 'আরজ আলি সমীপে' বইয়ের শেষের অধ্যায়টি পড়েছি, “বিবর্তন” নিয়ে লেখা অংশটুকু। তিনি যেরকম আক্রমনাত্মক ভঙ্গিমায় লিখেছেন, তাতে আমি বিস্মিত, শিহরিত। ফ্লাট আর্থ সোসাইটির লোকেরা যেভাবে নাসার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে, উনার লেখাগুলোও ঠিক সেরকম- বিবর্তনের বিরুদ্ধে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানুষজন সেগুলো গ্রহণও করে। এজন্যই কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। সময় কম, তাই সবচেয়ে দৃষ্টিকটু অংশগুলো নিয়েই লিখছি।

তিনি লিখেছেন, “আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা এবং প্রতারণার নাম বিবর্তনবাদ”

এ প্রশ্নের উত্তরে আমি যে বিষয়ে কাজ শুরু করেছি সেটা বলি। Caenorhabditis elegans নামের নেমাটোডা পর্বের একটি ক্রিমির উপরে আমার কাজ। একই পরিবেশ, তাপমাত্রা ও খাদ্যের প্রভাবে c. elegans এর locomotion অর্থাৎ চলাফেরা কিভাবে বিবর্তিত হয় এটা দেখার জন্য ২৪০ টি প্রজন্ম পর্যন্ত প্রজনন করা হয়েছে। প্রতি প্রজন্মে দশ হাজার করে ক্রিমি উৎপাদন করা হয়েছে। এরমধ্যে মেইন পপুলেশন হিসেবে নেয়া হয়েছে এক হাজার। এভাবে ৭ বছরে ২৪০ টা প্রজন্ম। আর এই ওয়ার্মগুলো কিভাবে তুলে জানেন? রীতিমত একটা একটা করে তুলতে হয়, অনেক শ্রমসাধ্য কাজ। ভিডিও দিলাম, দেখে নিতে পারেন। আর আপনি বলেন এগুলো প্রতারণা? প্রতারণার জন্য মানুষ এত শ্রম দেয়? এত কষ্ট করে?

আপনি বলেছেন, “বিবর্তনের পক্ষে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।“ অথচ এর প্রমাণ এত বেশি যে লিখতে চাইলে আস্ত একটা বই লেখা যাবে। এই লিংকে পড়ে নিন, কত প্রমাণ চান।

এরপর আপনি বলেছেন “পশ্চিমা বিশ্বে পদোন্নতি পেতে হলে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান পেতে হলে চোখ বন্ধ করে বিবর্তন বিশ্বাস করতে হয়। একজন বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেন না তার সম্মান, মর্যাদা, ইত্যাদি হারানোর ভয়ে।“

সিরিয়াসলি ভাই? একথা শুনলে নারায়ণের কর্তৃপক্ষও লজ্জা পাবে। যেদেশে ফ্লাট আর্থ সোসাইটির মহাসম্মেলন হয়, সেদেশে ভয়ে বিবর্তন বিশ্বাস করবে? সদ্য সাবেক হওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আপনার কী মনে হয়? ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ইন্টারভিউয়েই স্বীকার করেছেন যে সে বিশ্বাস করেন না। আপনি এই আজগুবি তথ্য কোথায় পেয়েছেন ভাই?

আপনি এর স্বপক্ষে “অনুজীব বিজ্ঞানী” জোনাথন ওয়েলসের উক্তি দিলেন। উনি বলেছেন, বিবর্তনের বিপক্ষের প্রমাণগুলো অদৃশ্য করে ফেলা হয়, ধামাচাপা দেয়া হয়। তো আমি এই অণুজীব বিজ্ঞানীর প্রোফাইল ঘাটাঘাটি করে দেখলাম। উনার মাস্টার্স এবং পিএইচডি ছিলো রিলিজিয়াস স্টাডিসে। তিনি অনেক আগে থেকেই এন্টি ইভুল্যুশনিস্ট। এরপর ১৯৯৪ সালে তিনি মাইক্রোবায়োলজিতে সেকেন্ড পিএইচডি নিয়েছেন, উনার পাবলিকেশন তিনটি, মাত্র একটিতে ফার্স্ট অথর। অর্থাৎ ডিগ্রি নিতে যতটুকু কাজ করতে হয় ততটুকু।

অথচ এই ডিগ্রি নিয়ে এরপর তিনি যোগ দিয়েছেন ডিসকভারি ইন্সটিটিউটে, যারা ক্রমাগত বিবর্তনের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করে। এরপর গবেষণার সাথে নূন্যতম সম্পর্ক নেই, কোথাও কোন কাজের খবর নেই, অথচ তিনি নাম প্রকাশ করছেন অণুজীব বিজ্ঞানী হিসেবে। অথচ মজার ব্যাপার কি জানেন? উনার প্রথম পিএইচডির ডিসারটেশন টপিক দেখেন,

“Wells, John Corrigan. 1986. CHARLES HODGE'S CRITIQUE OF DARWINISM: THE ARGUMENT TO DESIGN (EVOLUTION, THEOLOGY). Ph.D. Dissertation, Yale University, 265 pages.”

ডিসারটেশন পেপারের কিছু অংশ পড়ে দেখেছি। পরতে পরতে ঘৃণা, ঠিক আপনি যেমন প্রকাশ করেছেন সেরকম।

পেপারমথের উদাহরণটি প্রমাণ করে আপনি বিবর্তনের কিছুই বোঝেননি। “প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তিত হওয়া” এটি ল্যামারকের হায়পোথেসিস। বিবর্তনের মেইন বেসিস হচ্ছে রিপ্রোডাকশন। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস নিয়ে উদাহরণ দিই। ধরেন, করোনাভাইরাসের আক্রমণে দুর্বল সব মানুষ মারা গেলো। এরপর যারা সুস্থ হলো, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মে কিছুই হবে না। কারণ তাঁদের ইমিউন সিস্টেম বিবর্তিত হয়েছে। এভাবে অতীতের অনেক ভয়াবহ রোগ পরিণত হয়েছে আজকের সাধারণ সর্দিকাশিতে। এটা বিবর্তনের প্রত্যক্ষ উদাহরণ।

এরপর বললেন, কোন মিউটেশন উপকারী নয়। সিরিয়াসলি ভাই? আপনি এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এর কথা শোনেননি? প্যাথোজেনরা কিভাবে শক্তিশালী হয় জানেন না? ইদানীং মশার কয়েলে মশা মরে না, এটা দেখেন না? কো-এভুলিউশনের চমৎকার উদাহরণ হতে পারে হিউম্যান-প্যাথোজেন রিলেশনশীপ। একদিকে মানুষের যেমন সাধারণ রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ছে, অন্যদিকে ভাইরাস মিউটেটেড হয়ে ফেরত আসছে। করোনাভাইরাস কিন্তু অনেক আগে থেকেই ছিলো। কভিড-১৯ একটি নতুন স্ট্রেইন।

“কোন মিউটেশনই উপকারী নয়” এই কথার রেফারেন্স দিয়েছেন B.G Ranganathan এর। উনার শিক্ষাগত যোগ্যতা? তিনি ব্যাচেলর্স ডিগ্রি নিয়েছেন বাইবেল স্ট্যাডিজের উপরে এবং মাইনর ছিলো বায়োলজি, ব্যাস। মাস্টার্স ডিগ্রি পর্যন্ত নেই। অথচ উনি মন্তব্য করেছেন ইভুল্যুশনারি বায়োলজির কোর একটি টপিক নিয়ে, মিউটেশন, অতি চমৎকার!

আপনি বলেছেন, “দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তনবাদীরা মাছির উপরে মিউটেশনের কাজ চালিয়ে মাছির একটি নতুন প্রজাতি তো দূরের কথা, একটা নতুন এনজাইমও এখন পর্যন্ত তৈরি করে দেখাতে পারেনি।" বিশ্বাস করেন আরিফ আজাদ ভাই, একথা যদি আমার ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষের কোন ছাত্রও শুনে তাহলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে। প্রমাণ দেয়ার আগে প্রজাতির বায়োলজিক্যাল সংজ্ঞাটা বলে নিই,

“A biological species is a group of organisms that can reproduce with one another in nature and produce fertile and viable offspring.”

লক্ষ্য করুন, এখানে দুটো জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ, প্রজননে সক্ষম এবং সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান জন্মদান করতে পারতে হবে। এজন্য দৈহিক গঠনে অনেক পার্থক্য থাকার পরও গ্রেইট ডেন এবং পুডলস কুকুরকে আমরা একই প্রজাতি বলি, অথচ সিংহ এবং বাঘকে একই প্রজাতি বলি না । কারণ? বাঘ-সিংহের মিলনে লাইগার জন্ম নিলেও সে প্রজননে সক্ষম হয় না।


এখন ফিরে আসি মাছির ক্ষেত্রে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, drosophila melanogaster। কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে ল্যাবে এই মাছি থেকে উৎপন্ন করা হয়েছে drosophila synthetica. এই আর্টিকেলটি পড়ে নিতে পারেন।

আর বললেন, কিছুই পরিবর্তন করতে পারেনি? আপনার কথা সত্য হলে আধুনিক জীববিজ্ঞানের বিশাল একটা ফিল্ড, “জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং” মূল্যহীন হয়ে যায়। জিনেটিক মার্কারের নাম শুনেছেন সম্ভবত। আমরা drosophila melanogaster বা c. elegans এর পুরো জিনোম সিকুয়েন্স জানি। তো আপনি গবেষণার সময় কোনটা কোন মাছি চিনবেন কিভাবে? এজন্য জিন একটু পরিবর্তন করে চোখ লাল করে দেয়া হয়, কখনো পাখা ট্রান্সপারেন্ট করে দেয়া হয়। c. elegans এর রঙ ফ্লোরিসেন্ট করে দেয়া হয় যেন জ্বলজ্বল করে। আপনি যদি মনে করেন সব ষড়যন্ত্র, আমাদের ল্যাবে আপনাকে আমন্ত্রণ, কফি খেতে খেতে সব ঘুরে দেখাবো।

এখানে আপনি Michel Pitman রেফারেন্স দিয়েছেন। আবার ঘাটাঘাটি করে দেখলাম তিনি ক্যামব্রিজের একজন স্কুলশিক্ষক, যিনি ক্লাসে বায়োলজি পড়ান। প্রত্যাশিতই ছিলো। মাইকেল পিটম্যানকেও আমার পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানাবেন মিউটেশন কিভাবে ঘটে সেটা নিজ চর্মচক্ষে দেখার জন্য।


এরপর আসি আপনার ফসিল গবেষণায়। আপনার লেখা অনেকটা এরকম যে বিজ্ঞানীরা অনেক কষ্টে একটা করে ফসিল নিয়ে আসে এবং সাধারণ পাবলিকের কাছে ধরা খায়। আপনার উল্লেখিত ফসিলের ঘটনা ব্যাখ্যা করেই শুরু করি।

পিল্টডাউন ম্যান: ১৯১২ সালে চার্লস ডওসন নামক একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ জালিয়াতির মাধ্যমে পিল্টডাউন ম্যান তৈরি করেন। এই জালিয়াতির কারণ কী? নিজেকে বিখ্যাত করে তোলা। যদিও শুরু থেকেই গবেষকরা এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৯১৩ সালেই লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক David Waterston ন্যাচার জার্নালে তার সন্দেহ প্রকাশ করেন। ১৯১৫ সালে ফ্রেঞ্চ প্রত্নতত্ত্ববিদ Marcellin Boule একই কথা বলেন। এরপর আমেরিকান প্রাণীবিজ্ঞানী Gerrit Smith Miller ও সহমত প্রকাশ করেন। ১৯২৩ সালে জার্মান গবেষক Franz Weidenreich ফসিল পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এটি আধুনিক মানুষের ক্রেনিয়াম ও ওরাংওটাং এর চোয়ালের সমন্বয়ে বানানো।

অবশেষে ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে Kenneth Page Oakley, Sir Wilfrid Edward Le Gros Clark and Joseph Weiner অফিশিয়ালি প্রমাণ করেন যে এই পিল্টডাউন ম্যান সাজানো। এইযে এতগুলো মানুষ, সবাই কিন্তু বিবর্তন গবেষক, সবারই অসামান্য অবদান আছে বিবর্তন গবেষণায়। তাহলে কেন তাঁরা পিল্টডাউন ম্যানের জালিয়াতি ফাঁস করলেন? (সূত্র- Piltdown Man)

নেব্রাস্কা ম্যান: এই নেব্রাস্কা ম্যান ছিলো Dr. Henry Osborn এবং Dr. William D. Matthew এর অনিচ্ছাকৃত ভুল। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নেব্রাস্কা ম্যান গবেষকদের কাছে কখনোই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য ছিলো না, যতটা বিবর্তন বিরোধীরা এটা নিয়ে মাতামাতি করেন। (সূত্র: The role of "Nebraska man" in the creation-evolution debate)

ও, ভালো কথা আপনি যে William Bryan এর গবেষনার কথা বললেন, উনি মোটেও কোন গবেষক ছিলেন না। উনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ ও ধর্মপ্রচারক, যিনি বিবর্তনবিরোধী আন্দোলনের জন্য বিখ্যাত। ১৯২৫ সালে স্কুলে বিবর্তন পড়ানো বন্ধের জন্য করা কুখ্যাত Scopes Trial এ তিনি প্রত্যক্ষ সমর্থন প্রদান করেন। উনার জীবনী উইকিপিডিয়াতেই পাবেন।

ওটা বেংগা: “বিবর্তনবাদীরা ওটা বেংগাকে শেকল দিয়ে ধরে নিয়ে আসে” এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। ওটা বেংগাকে কে নিয়ে আসে জানেন? Samuel Phillips Verner নামের একজন খ্রীস্টান মিশনারি। চিড়িয়াখানায় পয়সা কামানোর আশায় তাঁকে অন্যান্য প্রাণীর সাথে প্রদর্শন করা হয় যার সাথে বিবর্তন গবেষকদের দূরবর্তী সম্পর্ক পর্যন্ত ছিলো না। অথচ মজার ব্যাপার, খ্রীস্টান ধর্মযাজকরাই তখন ডারউইনের পেছনে উঠে পড়ে লাগেন। জেমস গরডন নামক একজন পাদ্রী বলেন, “The Darwinian theory is absolutely opposed to Christianity, and a public demonstration in its favor should not be permitted.”


অথচ আজ পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী বা গবেষক বলেননি যে আমাদের homo গণের অন্য কোন প্রজাতি গত চল্লিশ হাজার বছরে জীবিত ছিলো। সেখানে বিবর্তন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন এমন কেউ ওটা বেংগাকে মানুষ ও উল্লুকের মধ্যবর্তী বলবেন সেটা অবিশ্বাস্য।

এর মধ্যে আপনি আরেকটি তথ্য গোঁজামিল দিয়েছেন। ওটা বেংগাকে ওই চিড়িয়াখানা থেকে উদ্ধার করেন গরডনই। তাঁকে ইংরেজি শেখানো হয়, তার জন্য ফান্ড তোলা হয়, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। প্রবল ডিপ্রেশনে পড়ে সে আত্মহত্যা করে ১৯১৬ সালে, চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের বারো বছর পর। ওটা বেংগাকে চিড়িয়াখানায় প্রদর্শন নিঃসন্দেহে ঘৃণ্য একটি কাজ। কিন্তু আপনি এজন্য বিবর্তন বিজ্ঞানীদের দোষ দিচ্ছেন, যা রীতিমত হাস্যকর।

এরপর আপনি নিয়ে আসলেন আরও দুটি ফসিল, এবং এর মাধ্যমে আপনি প্রমাণ করলেন যে বিবর্তন মিথ্যা। এইযে নীচের লিস্টসহ ছয় হাজারের বেশি ফসিল সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? হ্যাঁ হয়তো, শ্রেণীবিন্যাসে ভুল হতে পারে, পরীক্ষানিরীক্ষায় পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু তার মানে এই না যে সবগুলো মিথ্যা, জোচ্চুরি! আর এই ভুলগুলো কোন ধর্মযাজক কিন্তু বের করেননি, বের করেছেন জীববিজ্ঞানীরাই! রোগ নির্ণয়ের সময় কি ভুল হয় না? তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানেই ভুয়া?


Java Man (Homo erectus) (1891)

Heidelberg Man (Homo heidelbergensis) (1907)

Peking Man (Homo erectus) (1921)

Rhodesian Man (Homo rhodesiensis) (1921)

Taung Child 1 (Australopithecus africanus) (1924)

Galilee Man (Homo heidelbergensis) (1925)

Mojokerto child (Homo erectus) (1936)

Mrs. Ples (Australopithecus africanus) (1947)

Saldanha man (Homo rhodesiensis) (1953)

nutcracker man (Paranthropus boisei) (1959)

Chellean Man (Homo erectus) (1960)

Tautavel Man (Homo erectus) (1971)

AL 288-1 (Lucy) (Australopithecus afarensis) (1974)

Dali Man (Homo erectus or Homo heidelbergensis or early Homo sapiens) (1978)

Turkana Boy (Homo ergaster) (1984)

Wushan Man (Homo erectus) (1985)

Altamura Man (Homo neanderthalensis) (1993)

Scladina (Homo neanderthalensis) (1993)

Ardi ( Ardipithecus ramidus ) (1994)

Eurydice (Paranthropus robustus)(1994)

Boxgrove Man (Homo heidelbergensis) (1994)

Ceprano Man (Homo cepranensis /Homo heidelbergensis)(1994)

Daka (Homo erectus) (1997)

Madam Buya (Homo heidelbergensis or Homo erectus) (1997)

Obi-Rakhmat (Homo neanderthalensis) (2003)

Hobbit (Homo floresiensis) (2003)

এখানে গুটিকয়েক লিস্ট দিয়েছি। নামকরণ হয়েছে ৬০০০ এর কিছু বেশি, গবেষণাগারে আছে এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশী। মহাকাশ গবেষণা শুনলেই যেমন আমাদের মাথায় আসে NASA, তেমনি বিবর্তন গবেষণায় আসে Smithsonian institute. লিংক দিলাম, লিংকে ঘুরে দেখে আসুন এ পর্যন্ত কি কি ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে, কতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, কতটুকু আমরা জানি না, এখনো ওপেন রিসার্চ কোশ্চেন কি কি, সব দেখতে পারবেন। So, Please!! Educate yourself!

এরপর আপনি Solly Zuckerman এর গবেষণার কথা বলেছেন। প্রথমত, অস্ট্রালোপিথেসাইনরা কখনোই দু’পায়ে হাঁটতো না, এই তথ্যটি ভুল। আপনার দেয়া, বইটি লিবজেন ও সাই হাবে খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। এক জায়গায় শুরুর কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে মনে হয়েছে এটি মূলত পলেটিক্যাল সায়েন্সের বই। বইয়ের পুরো নাম, “Beyond the ivory tower: the frontiers of public and private science”

যেহেতু আমি বইটি পড়তে পারিনি, তাই এটা নিয়ে মন্তব্য করবো না। কিন্তু কোথায় পনেরো বছরের গবেষণার ব্যাপারে পড়তে পারবো কাইন্ডলি বলবেন আমাকে? কিংবা বইটিতে যেখানে গবেষণার কথা লেখা আছে সেই পৃষ্ঠার ছবি? তবে আমি এটুকু জানি, Solly Zuckerman এর ক্লেইমটা ১৯৭০ সালেই ভুল প্রমাণিত হয়েছিলো, সেটা লুসিকে (australopithecus afarensis) খুঁজে পাওয়ার আগেই।

এরপরে আসি, Charles E. Oxnard এর বিষয়ে। আপনি কি Oxnard এর ১৯৭৫ সালের পেপার নিজে পড়েছেন? উনি কোথায় অকপটে বলেছেন যে দুই পায়ে হাঁটতো না? আমি এক্সাকটলি উনার কোটেশনটি দিচ্ছি- “while probably bipedal, australopithecines did not walk identically to modern humans”

উনি অন্য কোথায় অন্য কথা বলে থাকতে পারেন, সেটি জানি না। তবে উনার মেইন আর্গুমেন্ট ছিলো, অস্ট্রালোপিথেকাসের সাথে মানুষের চেয়ে এইপের সাদৃশ্য বেশি, যেটার বিপক্ষে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরাই অবস্থান নিয়েছেন। কেননা, Oxnard এর গবেষণা মূলত ছিলো মাল্টিভ্যারিয়েট এনালাইসিস ও সিমুলেশন নির্ভর, যেখানে অনেক কমপ্লেক্স ফ্যাকটরকে তিনি ইগ্নোর করেছেন।

এখন আমি আসি আপনার “১৯৯৪ সালে Holly Smith এর নিখুঁত গবেষণা” নিয়ে। আমি শিউর এই পেপারটিও আপনি নিজে পড়ে দেখেননি। এইযে আমি সংযুক্ত করলাম সাইহাবের লিংক, পুরো পেপারটি এখানে পড়তে পারবেন।

উনি এক প্রান্তে হোমো সেপিয়েন্স রেখে অপরপ্রান্তে আফ্রিকান এইপসদের রেখে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক মানুষের সাথে সাদৃশ্য বেশি erectus এবং neanderthal দের। অপরদিকে habilis এবং Australopithecus afarensis এর সাদৃশ্য বেশি এইপদের দিকে। কিন্তু পুরো পেপারের কোথাও তিনি বলেননি, homo habilis হোমোই না।

আমি রীতিমত ভিমড়ি খেয়েছি হোমো ইরেকটাসের কনফারেন্সের আষাঢ়ে গল্পে। নিজে যখন লিখেছিলেন তখনো এই কথা বিশ্বাস করেছিলেন ভাই? ১৮৯১ সালে Pithecanthropus erectus আবিষ্কার হওয়ার পর ১৯৯১ সালে এই আবিষ্কারে একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে হোমো ইরেক্টাসের রিসার্চ নিয়ে Senckenberg international conference হয়। আর আপনি বলেছেন হোমো ইরেকটাস আছে কি নাই এ নিয়ে বিতর্ক হয়? বিজ্ঞান কি বিতর্কের জায়গা? যে সম্মেলনে বিতর্ক করে সিদ্ধান্ত নিবে যে হোমো ইরেক্টাস বলে কিছু ছিলো না? মানে ভোটের মাধ্যমে বিল পাশ হবে যে হোমো ইরেকটাস আছে কি নেই? সিরিয়াসলি?

এইযে ধরেন আপনার Senckenberg এর আদি ও আসল ওয়েবসাইট। বের করে দেখান কোথায় লেখা আছে যে “বিশ লক্ষ বছরে একমাত্র হোমো সেপিয়েন্সই অন্তর্ভুক্ত?”

আপনি লিখেছেন, “বিবর্তনবাদী দৃশ্যপটের প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ধাপ্পাবাজি আর জালিয়াতির গল্প।” কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানেন ভাই? আপনার প্রত্যেকটি তথ্যই বিভ্রান্তিমূলক। এরপরেও আপনাকে বেনিফিট অফ ডাউট দিলাম, হয়তো যেখান থেকে জেনেছেন সেই উৎসটি ভুল। কিন্তু নিজের কাছে সৎ হয়ে, নিজেকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, আপনি যা লিখছেন তা কি পুরোপুরি জেনে-বুঝে লিখছেন? আপনার অসংখ্য অনুসারী বাংলাদেশে, যারা আপনার কথা অন্ধভাবে গ্রহণ করে। তাদের কাছে সঠিক তথ্যটি পৌঁছানো কি আপনার নৈতিক দায়িত্ব নয়?

শেষকথা- আপনি যেরকম ষড়যন্ত্রের রূপকথার গল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছেন, সেটি ভয়াবহ রকমের মিসলিডিং ও বিপজ্জনক। আর আপনার এত রাগ-ক্ষোভ কেন ভাই? কোন এক সময় আমেরিকা ঘুরতে আসেন, শুধু প্লেন ভাড়া আপনার (এটা আমি এফোরড করতে পারবো না), বাকি থাকা খাওয়া সব আমার। আমি আপনাকে সবকিছু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবো। মনে অবিশ্বাস, খুঁতখুঁতানি, সন্দেহ থাকুক আর না থাকুক, দেখে মজা পাবেন এটুকু আমি নিশ্চিত!