দেড়শ বছরের আলাউদ্দিন সুইটমিটের ঐতিহ্যের গল্প

 ১৮৬৪ সালে নিমকি, সমুচা আর কিছু মিষ্টিদ্রব্য নিয়ে চকবাজারে একটি দোকান খুলে বসেছিলেন আলাউদ্দিন হালওয়াই। 'আলাউদ্দিন সুইটমিট' নামের সে দোকান দেড়শো বছর পেরিয়ে আজও রাজত্ব করছে সুনামের সাথে। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও যে প্রতিষ্ঠানের মিষ্টিকে সবাই চেনে এক নামে!


এই বঙ্গদেশের মানুষের মিষ্টি নিয়ে আদিখ্যেতা জগদ্বিখ্যাত। সারা পৃথিবীতে আর কোনো জাতির মানুষের মিষ্টি নিয়ে এতটা মাতামাতি নেই, যতটা আমরা লক্ষ্য করি বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রে। সেজন্যেই একটু খেয়াল করলেই দেখতে পারা যাবে, এপার বাংলা আর ওপার বাংলা মিলিয়ে বিখ্যাত সব মিষ্টির দোকান। এমন সব দোকান, যারা বছরের পর বছর ধরে জগদ্বিখ্যাত মিষ্টি ও মিষ্টান্ন বানিয়ে খাইয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষজনকে। আমরা জানি,  বাঙ্গালীর যেকোনো কবজি ডুবিয়ে খাওয়া ভোজনের শেষপাতে রসগোল্লা-দই না এলে কেন যেন অপূর্ণই থাকে সব। ২০২০ সাল শেষ হয়ে যাচ্ছে আজ। যদিও তিতকুটে এক বছরই শেষ হচ্ছে এবার, তবুও শেষপাতে নাহয় মিষ্টি দিয়েই ইতি টানি। এমন এক মিষ্টির দোকানের গল্প দিয়েই শেষ করি আজ লেখা, যে দোকান ব্রিটিশ আমল থেকে মিষ্টিমুখ করিয়ে আসছে এই উপমহাদেশের আপামর মানুষকে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, বলছি আলাউদ্দিন সুইটসের কথা।

আলাউদ্দিন সুইটসের সূচনা হয় উনিশ শতকের শুরুর দিকে৷ আলাউদ্দিন হালওয়াই নামের এক মানুষ ছোটখাটো এক মিষ্টির দোকান খুলে বসেন ভারতের লক্ষ্ণৌতে। অসাধারণ স্বাদের মিষ্টি আর খুব কম দাম হওয়াতে, অল্পদিনের মধ্যে ব্যবসার সুনাম হয়ে যায় বেশ। আলাউদ্দিন তখন ভাবলেন, ব্যবসা বাড়াতে হবে৷ ছড়িয়ে দিতে হবে চারদিকে। কোথায় শাখা খোলা যায় ভাবতে ভাবতে তিনি পেয়ে গেলেন বাংলাকে। ঢাকার চকবাজারে খুলে ফেললেন আলাউদ্দিন সুইটের দ্বিতীয় শাখা। নাম একটু পরিবর্তন করে করা হলো- আলাউদ্দিন সুইটমিট।

এরপর থেকে দেড়শো বছর ধরে আলাউদ্দিন সুইটমিট আছে ঢাকার চকবাজারে। অল্প দামে মানসম্মত মিষ্টি বিক্রি করে দেড়শো বছর ধরে সুনাম ধরে রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান৷ এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, চকবাজারের এই জৌলুশহীন দোকানটি সময়ের বহু চলকে অনেক ইতিহাসের সাক্ষীও হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, দেশভাগ, মানচিত্রের কাটাকুটি... সব কিছুরই নীরব প্রত্যক্ষদর্শী  কাক-ভূশণ্ডি এই দোকান। এছাড়াও ভাষা আন্দোলন, গন অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ও দেখেছে আলাউদ্দিন সুইটমিট।

একাত্তরে এই দোকানটি পুড়িয়েও দিয়েছিলো দুর্বৃত্তেরা। সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁডিয়েছে আলাউদ্দিন হালওয়াই এর বংশধরেরা। শুধু যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তা না, বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ড। সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে সাভার ও গাজীপুরে এতিমখানা ও মাদ্রাসা পরিচালনা করে তারা৷ বিভিন্ন স্কুল, মসজিদের পরিচালনাও করছে এই প্রতিষ্ঠান, সময়ের সাথে সাথে।

আলাউদ্দিন সুইটমিটের মিষ্টি, সেমাই, ঘি সহ আরো পণ্য ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাইরেও। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ অনেক দেশেই রপ্তানি করা হয় এগুলো। এছাড়া আলাউদ্দিন সুইটমিটের শাখা আছে লন্ডন আর নিউ ইয়র্কেও৷ তারা চান পৃথিবীর আরো বহু দেশে ছড়িয়ে দিতে বাংলা মুলুকের এই মিষ্টান্নের স্বাদ।

যেকোনো ব্যবসার সাফল্যের একটাই মূলসূত্র- গ্রাহকের বিশ্বাস। কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একবার এই বিশ্বাস অর্জন করতে যদি সক্ষম হয়েই যায়, তবে তাদের আর টলানো যায় না। যেটি আমরা লক্ষ্য করি আলাউদ্দিন সুইটমিটের ক্ষেত্রে। সময়ের বহু প্রকোষ্ঠ দেখেছে এই প্রতিষ্ঠান। অনেকবার ধাক্কা খেয়েছে। নড়ে গিয়েছে। কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোটা সম্ভব হয়েছে গ্রাহকদের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের কারণে। আলাউদ্দিন সুইটমিট এভাবেই সুনামের সাথে আরো অজস্র বছর টিকে থাকুক, এটাই প্রত্যাশা ও কামনা।